এআই বলছে- সিটি টু সার্ফ হলো অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ও জনপ্রিয় বার্ষিক গণদৌড় প্রতিযোগিতা। এটি সিডনির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টর হাইড পার্ক থেকে শুরু হয়ে বন্ডাই সৈকতে গিয়ে শেষ হয়। ১৪ কিলোমিটার দূরত্বের এই প্রতিযোগিতায় প্রতি বছর লাখো মানুষ অংশ নেন। ১৯৭১ সালে প্রথম এই দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
শুরুতেই এই খটোমটো তথ্যগুলো দিয়ে রাখলাম যাতে পরবর্তীতে লেখাটা যেন নিরস না হয়ে যায়। গত কয়েক বছর যাবৎ আমি এই দৌড়ে অংশ নিচ্ছি। এর মধ্যে গতবার বাচ্চাদেরও নিয়ে গিয়েছিলাম। শেষ করতে ওদের অনেক কষ্ট হয়েছিল তাই এবার একাই অংশ নিয়েছিলাম। গতির ওপর নির্ভর করে এই দৌড় অনেকগুলো রঙে বিভক্ত।
আমি সবসময়ই শেষের দিকেরটার টিকিট করি কারণ প্রথমত আমি প্রতিযোগিতা পছন্দ করি না দ্বিতীয়ত আমি কোন পেশাদার দৌড়বিদও না। আমি এখানে যায় মূলত এই উৎসবের আবহটা উপভোগ করতে। সত্যি কথা বলতে এর প্রতিটা মুহূর্ত আমি মনপ্রাণ ভরে উপভোগ করি। আজকের লেখা সেই গল্প নিয়েই।

এবারের সিটি টু সার্ফ’এ দেখা হয়েছিল সুপার ম্যানের পরিবারের সাথে
অস্ট্রেলিয়ানরা নিজেদের জীবনকে সহজ করতে জীবনযাপনের সব উপকরণকেও সহজ করে নিয়েছে। এমনকি ভাষাটাকেও তারা নিজেদের মতো করে বলেন। যদিও ভাষাটা ইংরেজি কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণ আলাদা। আর কঠিন এবং বড় শব্দগুলোকে নিজেদের মতো করে বানিয়ে নিয়েছে। যেমন পথে ঘাটে পরিচিত বা অপরিচিত কাউকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কুশল বিনিময় করা তাদের স্বাভাবিক সৌজন্যের অংশ। সেখানে শুরু হয় গুড মর্নিং বা গুড আফটারনুন দিয়ে।
অবশ্য আফটারনুনকে তারা বলে ‘আরভো’। এরপর ‘হাউ আর ইউ’ টাকে এমনভাবে উচ্চারণ করে যে সেটা শোনায় ‘হাউ আ ইয়া’। অস্ট্রেলিয়া জীবনের শুরুতে এটা বুঝতেই আমার কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। আর ‘অস্ট্রেলিয়ান’ এই কথাটা উচ্চারণ করতে অনেক সময় ক্ষেপণ হয় তাই সেটা হয়ে গেছে ‘অজি’। যে কোনো প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে তাদের মুল স্লোগান হলো ‘অজি অজি অজি / ঐ ঐ ঐ’।

২০২৩ সালের সিটি টু সার্ফ’এ লেখকের বন্ধুরা
আপাতদৃষ্টিতে এর কোনো মানে নেই বলে মনে হলেও সব অস্ট্রেলিয়ানকে একই সুতোয় বাঁধে এই স্লোগান। যাইহোক ধান ভানতে শিবের গীত একটু গেয়ে নিলাম অজিদের মানসিকতা বুঝানোর জন্য। বাংলাদেশের মানুষের উৎসব প্রিয়তা বুঝানোর জন্য যেমন বলা হয় – বারো হাত কাকুরের তেরো হাত বিচি। অজিরাও তেমনি ভীষণ রকমের উৎসব প্রিয় জাতি।
সারা বছরই কোনো না কোনো উৎসব চলতেই থাকে। শীতকালের শেষের দিকে এসে প্রতি বছর এই দৌড় প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। আর এমন অদ্ভুত নামকরণের আমার একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। সিটি থেকে শুরু হয়ে বন্ডাই সৈকতে শেষ হয়। বন্ডাই সৈকত অজিদের কাছে এবং ভ্রমণ-পিয়াসীদের অন্যতম পছন্দের জায়গা। আর এখানে সার্ফিং করা যায়। তাই হয়তোবা এই প্রতিযোগিতার নাম সিটি টু সার্ফ।

রাস্তায় চলে বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা – ২০২৩ সালের ছবি
আগেই বলেছি গতির ওপর নির্ভর করে এই প্রতিযোগিতাকে অনেকগুলো রঙে ভাগ করা হয়। একেবারে শেষের রংটা হলো অরেঞ্জ। এটা আসলে আর দৌড় থাকে না। এটা হয়ে যায় হাঁটা। ঠিক অনেকটা প্রাতঃভ্রমণ এর মতো। আমি অবশ্য নাম দিয়েছি আনন্দ ভ্রমণ। প্রায় সব বয়সের মানুষ এই বিভাগে অংশ নেয়। দাদা দাদি আসেন নাতি নাতনিকে নিয়ে।
বাবা-মা আসেন ছেলে মেয়েকে নিয়ে। উঠতি বয়সীরা আসেন বন্ধুবান্ধব মিলে দলবদ্ধ হয়ে। আর কত দেশের মানুষ যে এতে অংশ নেন তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। আর এই প্রতিযোগিতার সব বিভাগের টিকিট অনলাইনে ছাড়ার সাথে সাথেই প্রায় শেষ হয়ে যায়। আমি তাই আগেভাগেই টিকিট করে নিয়েছিলাম।
গত রোববার (৯ আগস্ট) ছিল এই প্রতিযোগিতার দিন। অরেঞ্জ রঙের দৌড় শুরু হবার সময় ছিল সকাল নয়টা বেজে ২৭ মিনিট। আর সবাইকে অন্ততপক্ষে ৪৫ মিনিট আগেই হাজির থাকতে বলা হয়েছিল। আমিও সেটা মাথায় রেখে আগেভাগেই ট্রেনে চড়ে বসলাম। ট্রেনে যেতে যেতে অন্যান্য স্টেশন থেকে আরো অনেকেই উঠলেন যারা সিটি টু সার্ফ-এ যাচ্ছেন। সেন্ট জেমস স্টেশনে নেমে ম্যাকুয়ারি স্ট্রিট এ এক্সিট নিলাম।
২০২৩ সালের সিটি টু সার্ফ’এ দেখা হয়েছিল শাড়ি পরা এক মহিলার সাথে
বের হয়েই দেখি লোকে লোকারণ্য। তখনও অরেঞ্জ রঙের দৌড় শুরু হয়নি। সবাই তাই শান্তভাবে ওখানে অপেক্ষা করছেন। আমিও সেই দলে ভিড়ে গেলাম। ওখানে পরিচয় হল এক দম্পতির সাথে। তাদের বয়স আশির কোটা ছাড়িয়ে গেছে। উনারা অনেকদিন পর আবারও এসেছেন তাই বেশ উচ্ছসিত দেখাচ্ছিল।
এরপর আমরা একটু এগিয়ে শুরুর লাইনের দিকে গেলাম। শুরুর লাইনের অন্যদিকে তখন ইয়েলো রঙের প্রতিযোগীরা অপেক্ষা করছিল। দূর থেকে শুধু তাদের মাথাগুলোকে বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল। অবশ্য বড় পর্দায় তাদের দেখা যাচ্ছিল। এর মধ্যেই ডিজে এসে আমাদের দলের অনেকের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়সহ কে কোথা থেকে এসেছেন এইসব জেনে নিচ্ছিলো।
ইয়েলো রঙের সবাই চলে যাওয়ার পর অরেঞ্জ এর জন্য পথ খুলে দেওয়া হলো। কমবয়সীরা তখনই দৌড় শুরু করলো। তাদের দেখাদেখি আমার সাথের দুজনও দৌড় দিচ্ছিল। আমি বললাম – সেইভ ইউর এনার্জি। বাকি রাস্তাটা কিন্তু বেশ কঠিন। অনেক উঁচু-নিচু আছে। এরপর বললাম তোমরা তোমাদের মতো করে উপভোগ করো। আমি এগিয়ে যায়। বলেই আমি আবার জনসমুদ্রে হারিয়ে গেলাম।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারও রাস্তায় রাস্তায় প্রতিযোগীদের উজ্জীবিত করতে বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন জাতি এবং সংস্কৃতির মানুষ তাদের নিজস্ব সংগীত, নৃত্যকলা পরিবেশন করছিল। আর কিছুদূর পরপরই ছিল পানি পান করার ব্যবস্থা।
সিটি টু সার্ফ’র শেষ – ২০২৩ সালের ছবি
এছাড়াও অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিযোগীদের উৎসাহ দিচ্ছিল। অনেকেই তাদের বাড়ির সামনে বিভিন্ন রকমের খাবার বিনামূল্যে বিতরণ করছিল। আবার অনেকেই গরম থেকে প্রতিযোগীদের একটু রেহাই দিতে পানির পাইপ দিয়ে কুয়াশার মতো করে পানি বর্ষণ করছিলেন।
এছাড়াও অনেক বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চারা লেমনেড, পানীয় বিক্রি করে বিভিন্ন দাতব্য কাজের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিল। আমি সাধারণত চেষ্টা করি এসময় তেমন পানি বা খাবার না খেতে কারণ তাহলে শরীর ভারী হয়ে যায় আর হাঁটতে বেশি কসরৎ করতে হয়। এছাড়াও কিছুদূর পরপর ছিল প্রসাধন কক্ষ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলো।
আমার পাশেই একজন ভদ্রমহিলা প্রামে তার বাচ্চাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু রাস্তাটা সামনের দিকে উঁচু হওয়ায় বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি কি না। উনি সানন্দে রাজি হলেন। আমি উনার প্রাম ঠেলে খাড়ি টুকু পার করে দিলাম। এরপর দেখা হলো এক ভদ্রমহিলার সাথে। উনি দুই হাতে দুটো লাঠি নিয়ে হাঁটছেন।
তাকে ঘিরে পরিবারের সদস্যরা হাঁটছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনার বয়স কত। উত্তরে বললেন, ৯৩ বছর। শুনে আমি বললাম, আপনাকে উনিশ বছরের তরুণীর মতো দেখাচ্ছে। শুনে উনি হাসতে শুরু করলেন। এরপর এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হলো তিনি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে অংশ নিচ্ছেন।
বয়স জিজ্ঞেস করাতে বললেন, বয়স শুধুমাত্র একটা সংখ্যা। এরপর একজন ভদ্রমহিলার জামার পেছনে লেখা দেখলাম, আমি দৌড়াচ্ছি আমার বাবার জন্য। সাথে বাবার একটা ছবিও প্রিন্ট করা। উনি উনার বাবাকে নিয়ে অনেক স্মৃতিচারণ করলেন।
এক বাড়ির সামনের উঠোনে আলুর চিপস আর পানি রাখা হয়েছে। বাড়ির একটা বাচ্চা ছেলে আবার ট্রেতে করে সেই পানি প্রতিযোগীদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি চিপস নিতে নিতে বললাম, তোমরা খুব ভালো, তোমরা প্রতি বছর এটা করে আমাদের উৎসাহ দাও। অশেষ ধন্যবাদ তোমাদের।
সিটি টু সার্ফ’র শুরু – ২০২৩ সালের ছবি
এরপর আরেক বাড়ির সামনে সবাইকে পানির সাথে বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে। আমিও হাত বাড়িয়ে একটা বিস্কুট নিলাম। কি যে স্বাদ সেই বিস্কুটের। এছাড়াও পথে যেতে যেতে অনেক শিশুদের সাথে হাই ফাইভ দিলাম যারা হাত বাড়িয়ে রেখেছিল। একটা জায়গায় বৃদ্ধাশ্রম। সেখানকার অধিবাসীরা তাদের আঙিনায় বসে দৌড় উপভোগ করছেন। আমি রাস্তা ছেড়ে তাদের হাই ফাইভ দিলাম। উনারা যেই হাসি দিলেন সেটা একেবারে অমূল্য।
এক জায়গায় দেখলাম এক ভদ্রলোক উল্টো হয়ে দৌড়াচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কেন এভাবে দৌড়াচ্ছেন। উত্তরে বললেন, আমার স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলেছি। আমি বললাম, সেটাতো বিশাল সুখবর। এরপর দুজনেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখি এক ভদ্রমহিলা একটা প্রাম নিয়ে কিছুদূর যাচ্ছেন আর থেকে পেছনে তাকাচ্ছেন। আমি তাকে আগের ভদ্রলোকের ঘটনা বললাম। সাথে সাথে উনি জিজ্ঞেস করলেন, তার মাথায় কি তটুপি ছিল. আমি বললাম, অত খেয়াল করিনি কিন্তু আপনি কেন জানতে চাইছেন। উনি বললেন, আমি পেছনে তাকিয়ে আমার স্বামীকে খুঁজছি। শুনে হাসতে হাসতে আমি বললাম, আমি কিন্তু আসলে ঐ লোককে এগুলো বলিনি। এরপর আমরা দুজনেই হাসা শুরু করলাম।
এরপর এক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম বুকের ব্যাগের মধ্যে একটা বাচ্চা নিয়ে হাঁটছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওর বয়স কত। উত্তরে বললেন, মাত্র ছয় মাস। আমি বললাম আমার জানামতে ও ই সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিযোগী। ওর জন্য অনেক দোয়া রইলো। এরপর প্রতিযোগিতা শেষ করে মেডেল নেওয়ার পালা। যিনি মেডেল দিচ্ছিলেন তাকে বললাম, আমাকে পরিয়ে দেন। উনি হাসিমুখে আমার গলায় পরিয়ে দিলেন। এরপর দেখা হলো একদল মহিলার সাথে যারা শাড়ি পরে অংশ নিয়েছিলেন।
তাদের বললাম, আমি গত বছর একজনকে পেয়েছিলাম যিনি শাড়ি পরে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর একটা পরিবার পেলাম যাদের বাবা মা থেকে শুরু করে পরিবারের সব সদস্যই সুপার ম্যান, সুপার গার্ল’র পোশাক পরে আছে। এরপর পরিচয় হলো দুজনের সাথে যারা বিখ্যাৎ কার্টুন চরিত্র মারিও ব্রাদার্স’র মতো পোশাক পরে আছে। তাদের সাথে ছবি তুলতে তুলতে বললাম, মারি ব্রাদার্স আমার ছেলের খুব পছন্দের। ওকে এই ছবি দেখাবো আর বলবো যে ও কি মিস করেছে। এরপর ধীরে ধীরে বাসের লাইনে এগিয়ে গেলাম বাসায় ফেরার জন্য।










