ব্রাজিলকে ঠিক ‘ব্রাজিলীয়’ মনে হলো না মরক্কোর বিপক্ষে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বরং দাপটের সঙ্গে খেলেছে মরক্কোই। যার ফল পেয়েছে তারা। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলকে জিততে দেয়নি। ১-১ গোলে ড্র করেছে। প্রথম ম্যাচেই মরক্কোর সঙ্গে হোঁচট খেয়ে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নিতে হয়েছে সেলেসাওদের।
নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রায় ৮০ হাজার দর্শক হাজির হয়েছিল ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ দেখার জন্য। হাজির ছিলেন ব্রাজিলস বিভিন্ন দেশের কিংবদন্তীরা। এছাড়া সারা বিশ্বের কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্ত বসেছিল টিভির সামনে। প্রিয় দলের ছন্দময়, নান্দনিক ফুটবল দেখার জন্য।
কিন্তু সেলেসাওদের খেলা চরম হতাশ করেছে ভক্ত-সমর্থকদের। ছন্দ আর নান্দনিকতার ছিটেফোটাও ছিল না ব্রাজিল ফুটবলারদের খেলায়। বরং, মরক্কোর ‘টাফ’ ফুটবলের সামনে মাঝে-মধ্যে বেশ অসহায় মনে হয়েছে ব্রাজিলিয়ানদের। কোনো পজিশনেই আনচেলত্তির শিষ্যরা আপ-টু দ্য মার্ক ছিল না। অনেকটা ছন্নছাড়া ফুটবল খেলেছে।

বলের পজিশনিং ঠিক ছিল না, একটি বল রিসিভ করা, ধরে রাখা কিংবা সঠিকভাবে পাস দেওয়া- তার কিছুই ছিল না বলতে গেলে এই ব্রাজিল দলটার মধ্যে। যদি বলা হয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই ব্রাজিল দলটাই সবচেয়ে দুর্বল, তাহলে হয়তো খুব একটা কম বলা হবে না।
নিউ জার্সির তীব্র গরমে অনুষ্ঠিত গ্রুপ পর্বের প্রথমে ইসমাইল সাইবারির গোলে পিছিয়ে পড়লেও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত একক নৈপুণ্যে সমতায় ফেরে সেলেসাওরা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে বহু চেষ্টা করেও আর জয়ের দেখা পায়নি তারা।
প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শুরু হওয়া ম্যাচে শুরু থেকেই ব্রাজিলকে চাপে রাখে মরক্কো। বল দখলে পিছিয়ে থাকলেও আক্রমণে ছিল অনেক বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী। ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই মাজরাউইয়ের ক্রস থেকে এল আয়নাউইয়ের শট ব্লক করে ব্রাজিলকে রক্ষা করেন ব্রুনো গিমারায়েস। একই আক্রমণে আশরাফ হাকিমির নিচু শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
প্রথম ৩০ মিনিটে মরক্কো ১২টি শট নেয়, যা ব্রাজিলের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে বিরল ঘটনা। ২০১৮ সালে মেক্সিকোর বিপক্ষে ১৪টি শট হজম করার পর কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে এতটা চাপের মুখে পড়তে হয়নি সেলেসাওদের।
২১ মিনিটে সেই চাপেরই ফল পায় মরক্কো। মাঝমাঠ থেকে অসাধারণ এক থ্রু পাস দেন ব্রাহিম দিয়াজ। মারকুইনহোস ও গ্যাব্রিয়েলের মাঝখান দিয়ে ছুটে যাওয়া ইসমাইল সাইবারি বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অ্যালিসনকে লব করে জালে পাঠান। দারুণ ফিনিশিংয়ে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় অ্যাটলাস লায়ন্সরা।

গোল হজমের পর ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে ব্রাজিল। ৩২ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত সমতা। প্রায় একক প্রচেষ্টায় লেফট উইং ধরে মাঝ মাঠ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে আসেন ভিনিসিয়ুস। বক্সের কাচে এসে বল এগিয়ে দেন তিনি ব্রুনো গিমারায়েসের কাছে। এরপর ব্রুনো ফিরতি পাস দেন ভিনিসিয়ুসকে। সেই পাস পেয়ে বাম দিক থেকে ভেতরে কাট করেন এই রিয়াল তারকা। এরপর ডান পায়ে অসাধারণ কার্লিং শটে বল জড়িয়ে দেন বোনুর ডান পাশের জালে। জাতীয় দলের হয়ে নিজের ৫০তম ম্যাচে স্মরণীয় এক গোল উপহার দেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
প্রথমার্ধের শেষদিকে গোলের আরও সুযোগ তৈরি করেছিল ব্রাজিল। ৪৫+৩ মিনিটে লুকাস পাকেতার ভলি দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনু। কর্নার থেকে মারকুইনহোসের ফ্লিকও অল্পের জন্য গোল হয়নি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দুই হলুদ কার্ড পাওয়া খেলোয়াড় ক্যাসেমিরো ও রজার ইবানেজকে তুলে নেন আনচেলত্তি। তাদের জায়গায় নামেন ফাবিনহো ও দানিলো। পরিবর্তনের পর কিছুটা গতি বাড়ায় ব্রাজিল। ৫২ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের পাস থেকে ইগর থিয়াগোর শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন বোনু।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে প্রথমার্ধের মতো ধারাবাহিক আক্রমণ দেখা যায়নি। তীব্র গরমের প্রভাব স্পষ্ট ছিল দুই দলের খেলোয়াড়দের ওপর। কয়েকবার খেলা থামিয়ে ওয়াটার ব্রেক দিতে হয়। ফলে ম্যাচের গতি বারবার কমে যায়।
৬৭ মিনিটে রাফিনহার বিপজ্জনক ক্রস থেকে গোলের সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডরা। ৭৯ মিনিটে রাফিনহার নিচু শটও ঠেকিয়ে দেন বোনু। এরপর ৮৩ মিনিটে ইসা দিয়পের ভয়াবহ ব্যাকপাসে রাফিনহা একা এগিয়ে গেলেও দ্রুত বেরিয়ে এসে বিপদ সামাল দেন মরক্কোর গোলরক্ষক।
ম্যাচের শেষ দিকে মরক্কোও জয়ের জন্য চেষ্টা চালায়। বদলি খেলোয়াড়দের নিয়ে পাল্টা আক্রমণে ওঠে তারা। যোগ করা সময়ের নবম মিনিটে এল আয়নাউইয়ের দূরপাল্লার শট প্রথমে সামলাতে ব্যর্থ হন আলিসন। তবে ফিরতি বলে আয়ুব আমাইমুনিকে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত করে দুর্দান্ত ডাবল সেভ করেন ব্রাজিলের গোলরক্ষক।
১০ মিনিটের দীর্ঘ যোগ করা সময় শেষে আর কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয় ম্যাচ।
ম্যাচের পরিসংখ্যান বলছে, বল দখলে সামান্য এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। তবে দলগত পারফরম্যান্স, সুযোগ সৃষ্টি এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলে মরক্কো ছিল অনেক বেশি প্রাণবন্ত। অপটা সুপারকম্পিউটার হাফটাইমে ব্রাজিলকে জয়ের জন্য ৫০.৯ শতাংশ সম্ভাবনা দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি আনচেলত্তির দল।
ফলে ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপ শিরোপার খরা কাটানোর মিশনে ব্রাজিলের শুরুটা হলো হতাশাজনক। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিক উন্নতির প্রমাণ রেখে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিটের বিপক্ষে মূল্যবান এক পয়েন্ট তুলে নিল মরক্কো।









