যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা শত শত দাবানলের ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়ার পর কানাডার ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই হুমকির আগে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা কানাডার দাবানল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযোগ না করে আগুন নেভাতে সহায়তা পাঠানোর আহ্বান জানান।
ট্রাম্প বলেন, ‘নোংরা, দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাস অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে পড়ছে।
’ তিনি কানাডার ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলার’ অভিযোগ তুলে নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত দেশটিতে ৮৮৮টি দাবানল জ্বলছিল, যার বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।এর মধ্যে অন্টারিওতেই ১৯০টির বেশি আগুন জ্বলছিল, অনেকগুলোই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ফোন করে তার দেশের ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ সম্পর্কে জবাব চাইবেন।একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কানাডা তাদের বন ও ঝোপঝাড়ের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করছে না।
ট্রাম্পের রিপাবলিকান সহযোগীরা এ ঘটনাকে সামনে এনে আবারও কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার পুরোনো প্রস্তাবের কথা তুলেছেন। এ ধরনের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক কানাডীয় প্রতিবাদ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বন্ধ করে দিয়েছেন। অনলাইনে কেউ কেউ অন্টারিও ও মিশিগানকে সংযুক্তকারী কানাডা-অর্থায়িত গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু চালু করতেও বিলম্বের আহ্বান জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি কানাডা। তবে এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করা দুই দেশেরই দায়িত্ব।
গত এক বছরে মূলত বাণিজ্য ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক কয়েক দফা উত্তপ্ত হয়েছে। গত বছর ট্রাম্প কানাডার ওপর শুল্ক আরোপ করেন। দীর্ঘদিনের মুক্ত বাণিজ্য অংশীদার হলেও দুই দেশ এখনো নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।
কীভাবে শুরু হলো দাবানল?
কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর বনভূমি দাবানলে পুড়ে গেছে।
এর প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়েছে। মিনেসোটা, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, ওহাইও ও নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে।
বাতাসের মান ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছানোয় বহু এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং অসংখ্য উন্মুক্ত স্থানের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
সুইস বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ার-এর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাস ছিল ডেট্রয়েটে। এরপর ছিল শিকাগো, ওয়াশিংটন ডিসি এবং সপ্তম অবস্থানে নিউইয়র্ক।
কানাডীয় কর্মকর্তাদের উদ্দেশে লেখা এক খোলা চিঠিতে মার্কিন আইনপ্রণেতা জন জেমস, জন মুলেনার, জ্যাক বার্গম্যান ও লিসা ম্যাকক্লেইন বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে’।
তারা বলেন, ‘কাজের বদলে শুধু দুঃখ প্রকাশ আমরা আর মেনে নেব না।’ কানাডা কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সীমান্তবর্তী দাবানল নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ভূমিকা রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে বলে সতর্ক করেন তারা।
তাদের দাবি, গত বছর এ বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে ‘প্রতি বছর কানাডার নিষ্ক্রিয়তার মূল্য দিচ্ছে আমেরিকানদের ফুসফুস।’
তারা অভিযোগ করেন, বন পাতলা করা, আগুনের জ্বালানি কমানো, পরিকল্পিত আগুন এবং অগ্নিসংযোগ ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে বিবিসি ভেরিফাইয়ের সঙ্গে কথা বলা বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তব চিত্রটি আরও জটিল।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. প্যাট্রিক জেমস বলেন, আবহাওয়া আন্তর্জাতিক সীমান্ত মানে না। ধোঁয়া একবার বায়ুমণ্ডলে উঠে গেলে বাতাস যেদিকে নেয়, সেদিকেই ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় দাবানলের ধোঁয়াও কানাডায় পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানের অনেক দাবানলই কানাডার বিশাল ও দুর্গম বনাঞ্চলে জ্বলছে, যেখানে আগুন বড় আকার নেওয়ার আগেই তা শনাক্ত বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
তাদের মতে, বন ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে জনবসতির আশপাশে ঝুঁকি কমতে পারে, কিন্তু এত বিশাল বনাঞ্চলে দাবানল পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়।
কানাডায় দাবানল নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আগুনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুনের শেষ দিকে উত্তর অন্টারিওতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতই এর প্রধান কারণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও শুষ্ক আবহাওয়া দাবানলর মৌসুমকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। কিছু আগুন বজ্রপাত থেকেও শুরু হয়েছে।
ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আনাবেলা বোনাদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই শুধু কানাডাকে দায়ী করা বা বলা যে তারা একাই এসব দাবানল ঠেকাতে পারত, তা সঠিক হবে না।
অভিযোগ নয়, সহায়তা পাঠান
অন্টারিও রাজ্য সরকারের প্রধান ডগ ফোর্ড শুক্রবার মার্কিন আইনপ্রণেতাদের জবাবে বলেন, কানাডা অতীতে ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল ও নর্থ ক্যারোলিনার ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, ‘অভিযোগ করার বদলে সাহায্য পাঠান। আমরা আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের জন্য ঠিক সেটাই করেছি।’
ফোর্ড জানান, ডেমোক্র্যাট-শাসিত মিশিগান ও ম্যাসাচুসেটস ইতোমধ্যে পানি নিক্ষেপকারী বিমান, দমকলকর্মী ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সমালোচনার জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের দায়িত্ব সবার, সত্যিই সবার, যুক্তরাষ্ট্রেরও।’
তিনি জানান, তার সরকার প্রাদেশিক প্রশাসন ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে।
এদিকে ফোর্ড তার সরকারের সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি অগ্নিনির্বাপণ দল, ৮০টির বেশি পানি নিক্ষেপকারী বিমান ও হেলিকপ্টার আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
তিনি জানান, ২০১৮ সাল থেকে তার সরকার বনাঞ্চলের দাবানল মোকাবিলায় এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতি বছর বরাদ্দের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়।
আগুনে পুড়ছে জনপদ, ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে অঞ্চল
উত্তর অন্টারিওর কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাকে দাবানলর কারণে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একটি ফার্স্ট নেশনস সম্প্রদায়ের প্রধান জানিয়েছেন, তাদের পুরো বসতি ছাইয়ে পরিণত হয়েছে।
কানাডার পশ্চিম উপকূলেও আগুন জ্বলছে। শুক্রবার পর্যন্ত ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় ৫৯টির বেশি সক্রিয় দাবানলের খবর পাওয়া গেছে। প্রাদেশিক দাবানল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর মধ্যে ৩৯টি গত ২৪ ঘণ্টায় শুরু হয়েছে এবং ৩১টি আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় আরও আক্রমণাত্মক কৌশলে আগুন নেভানোর চেষ্টা চলছে।
উত্তর-পশ্চিম অন্টারিওর কয়েকটি বড় দাবানল থেকেই মূলত ঘন ধোঁয়া তৈরি হয়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক শহরে ধোঁয়ার ঘন আস্তরণে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং ও স্ট্যাচু অব লিবার্টি প্রায় আড়াল হয়ে যায়। একইভাবে ওয়াশিংটন ডিসির বিভিন্ন জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভও ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বিনামূল্যে মাস্কও বিতরণ করা হচ্ছে।
এর ফলে শিকাগো, ডেট্রয়েট, পেনসিলভানিয়া ও নিউ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় বাইরের কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পের কার্যক্রম ঘরের ভেতরে নেওয়া হয়েছে, কনসার্ট পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং জনপ্রিয় একটি হ্রদের তীরবর্তী সৈকতও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। খারাপ বায়ুমানের কারণে কিছু বিমানবন্দরেও ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নিউ জার্সির উন্মুক্ত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ম্যাচটি দেখতে ট্রাম্পের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।









