ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গুরুতর অসুস্থ—সম্প্রতি এমন দাবি করেছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলেও কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এসব প্রতিবেদনের কয়েক দিন পর মোজতবা খামেনিকে সুস্থ অবস্থায় দেখানো একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ।
ভিডিওটি কবে ধারণ করা হয়েছে, তা জানানো হয়নি। এতে মোজতবা খামেনিকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায়। তার স্বাস্থ্য ও অবস্থান নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা খণ্ডন করতেই ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত মেহর নিউজ এবারই প্রথম মোজতবা খামেনির এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করল। সংবাদ সংস্থাটি ইরান সরকারের ইসলামী উন্নয়ন সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। এর আগে শুক্রবার ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটজনক’।
ইসরায়েলি ‘চ্যানেল ১৪’ ইরানের ভেতরের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে এ দাবি করে।
একই সময়ে ইরানের সংবাদমাধ্যম ইরানওয়্যার এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, খামেনির স্বাস্থ্য নিয়ে ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ‘জেরুজালেম পোস্ট’-এর একটি সূত্র এমনও দাবি করে, শিগগিরই খামেনির মৃত্যুর খবর এলেও তারা অবাক হবে না। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। বরং নতুন ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তৈরি হওয়া জল্পনা দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তিনি সরাসরি বক্তব্যও দেননি। এখন পর্যন্ত লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। এ কারণে তার স্বাস্থ্য, অবস্থান এবং দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তার বাবার কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে চালানো প্রথম দফার হামলায় মোজতবা খামেনি আহত হন।
কিছু প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়, ওই হামলায় তার মুখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং চেহারায় পরিবর্তন আসে। এ কারণে তিনি জনসমক্ষে আসছেন না বলেও ধারণা করা হয়। হামলার পর নিজেকে নিরাপদ রাখতে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার ঝুঁকি এড়াতে তিনি ধীরগতির মধ্যস্থতাকারীদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এসব দাবি ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মোজতবা খামেনির অবস্থান নিয়ে জল্পনার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও তার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, খামেনির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা এখন ‘খুব কঠিন’। তার এই মন্তব্যের পর খামেনি কোথায় আছেন এবং কিভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। মোজতবা খামেনির অবস্থান ও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে শুধু ইসরায়েলি গণমাধ্যম নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
গত জুলাইয়ে সৌদি সংবাদমাধ্যম আল-হাদাথ ইসরায়েলি একটি নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করে, খামেনি ‘ইরানে নেই’। প্রায় একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে নির্মূল করা হয়েছে। সামরিক অভিযানের পর খামেনি ‘৯০ শতাংশ শেষ’ এবং অক্ষম হয়ে পড়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যেরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। এর আগে ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা খামেনির প্রাথমিক আহত হওয়ার ঘটনা গুরুতর নয় বলে জানিয়েছিলেন।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও তার আঘাতকে উপরিভাগের আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলে আসছেন, তিনি এখনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের নির্দেশনা দিচ্ছেন। অন্যদিকে পশ্চিমা ও বিরোধী গোয়েন্দা সূত্রগুলো বারবার দাবি করেছে, খামেনেই গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। এমনকি তাঁর মুখে গুরুতর আঘাতের কারণে চেহারা বিকৃত হয়ে থাকতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে ইরানের সরকারি বক্তব্য এসব দাবির সঙ্গে মেলে না।
এ অবস্থায় মেহর নিউজের প্রকাশ করা নতুন ভিডিওটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভিডিওতে মোজতবা খামেনেইকে সুস্থ অবস্থায় দেখা গেলেও এটি কবে ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে ভিডিও প্রকাশের পর তার স্বাস্থ্য নিয়ে জল্পনা কিছুটা কমলেও তার বর্তমান অবস্থান, নিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এবং কেন তিনি দীর্ঘদিন জনসমক্ষে আসছেন না—এসব প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে তাকে সুস্থ ও সক্রিয় হিসেবে তুলে ধরা হলেও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্র তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নতুন ভিডিও সেই বিতর্কের মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে।









