গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই ফ্রান্সের কাছেই হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ‘অ্যাটলাস সিংহ’ খ্যাত মরক্কোকে। বোস্টন স্টেডিয়ামে শেষ আটের ম্যাচটি তাই মরক্কোর জন্য ছিল মধুর প্রতিশোধের মঞ্চ।
তবে বুনুর অতিমানবীয় প্রতিরোধ সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হলো না আফ্রিকান দলটির। মরক্কোকে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখল বর্তমান রানার্সআপ ফ্রান্স।
ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে খেলে ফ্রান্স। প্রথম ৫ মিনিটের মধ্যেই দুইবার গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল তারা।তবে দুবারই মরক্কোর ত্রাতা হয়ে দেখা দেন গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু।
প্রথমার্ধের প্রথম ২০ মিনিটে আক্রমণের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল ফরাসিদের হাতেই।একাধিকবার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করলেও তারা জালের দেখা পায়নি। অন্যদিকে, মরক্কো মূলত প্রতি-আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলার চেষ্টা করলেও প্রথমার্ধে মাত্র একটি শট নিতে পারে, যা ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে কোনো পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি।
ম্যাচের ২৬ মিনিটে প্রতি-আক্রমণ থেকে বল নিয়ে মরক্কোর ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাকে বিপজ্জনকভাবে বাধা দিতে গিয়ে ফাউল করে বসেন নুসাইর মাজরাউই। রেফারি সঙ্গে সঙ্গেই ফ্রান্সের পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজালেও ২৯ মিনিটে বোস্টন স্টেডিয়ামকে স্তব্ধ করে দিয়ে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন এমবাপ্পে। তার নেওয়া দুর্বল শটটি বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর প্রাচীর ইয়াসিন বুনু।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফ্রান্সের হয়ে টানা ১৫টি পেনাল্টি সফলভাবে জালে জড়ানোর পর এই প্রথম স্পট-কিক থেকে ব্যর্থতার তেতো স্বাদ পেলেন এমবাপ্পে। এর আগে দেশের জার্সিতে তিনি সর্বশেষ পেনাল্টি মিস করেছিলেন ২০২০ ইউরোর শেষ ষোলোয় সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে।
৩৬ মিনিটে বক্সে দারুণভাবে ঢুকে শট নেওয়া দেজিয়ে দুয়েকে আবারও গোলবঞ্চিত করেন বুনু। বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ প্রতিপক্ষের নেওয়া ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে মাত্র ২টিতে পরাস্ত হয়েছেন বুনু; বাকি ৭টির মধ্যে ৪টি ঠেকিয়েছেন এবং ৩টি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। বুনুর এই অবিশ্বাস্য ফর্মের ওপর ভর করেই প্রথমার্ধে গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে যায় মরক্কো।
দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসি ঝড় ও এমবাপ্পের রেকর্ড
বিরতির পর মরক্কোর প্রতিরোধ ভেঙে দেয় ফ্রান্স। ম্যাচের ৬০ মিনিটে বক্সের কাছাকাছি জায়গা থেকে দুর্দান্ত এক শটে লক্ষ্যভেদ করে ফ্রান্সকে লিড এনে দেন রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ৮-এ নিয়ে গিয়ে তিনি আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসিকে স্পর্শ করেন।
এটি বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে এমবাপ্পের ২০তম গোল, যা সর্বকালের শীর্ষে থাকা মেসির (২১ গোল) চেয়ে মাত্র ১ গোল কম। মাত্র ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে সেনেগাল, ইরাক, সুইডেন, প্যারাগুয়ে ও মরক্কোর বিপক্ষে গোল করে মাত্র ২০টি ম্যাচ খেলেই ২০ গোলের এই অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, যা ক্লোস বা রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের চেয়ে অনেক কম ম্যাচ খেলে গড়া কীর্তি।
প্রথম গোলের মাত্র ছয় মিনিটের ব্যবধানে আবারও ধাক্কা খায় মরক্কো। কিলিয়ান এমবাপ্পের দৌড়ে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে সামনে এগিয়ে যান উসমান দেম্বেলে। এরপর নিচের কোণ লক্ষ্য করে নেওয়া তাঁর নিখুঁত শটে ব্যবধান ২-০ করে ফ্রান্সের সেমিফাইনাল প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেন তিনি।
ম্যাচের ৭৭ মিনিটে গোলদাতা এমবাপ্পেকে তুলে নিয়ে জ্যঁ-ফিলিপ মাতেতাকে মাঠে নামান ফরাসি কোচ। বাকি সময়ে মরক্কোর কোনো চেষ্টাই সফল না হওয়ায় ২-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ফ্রান্স। এই হারের মাধ্যমে বিশ্বকাপে মরক্কোর দুর্দান্ত যাত্রার সমাপ্তি ঘটল।
মেসি-এমবাপ্পের মহাকাব্যিক দ্বৈরথ
ফুটবল বিশ্ব এখন প্রত্যক্ষ করছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক পরিসংখ্যানগত লড়াই। একদিকে সর্বকালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতার আসনটি নিজের দখলে রেখেছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, যিনি এবারের আসরে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান, কেপ ভার্দে এবং মিশরের বিপক্ষে গোল করে নিজের বিশ্বকাপ গোলের সংখ্যা ২১-এ নিয়ে গেছেন।
অন্যদিকে প্রতি মুহূর্তেই সেই রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার হুংকার ছাড়ছেন এমবাপ্পে। মেসির চেয়ে আর মাত্র ১ গোল পিছিয়ে থাকা এমবাপ্পে সেমিফাইনালে এই ব্যবধান ঘুচিয়ে নিতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।









