ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ ও ভবিষ্যৎ পারমাণবিক আলোচনার পথ খুলতে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র- এমনটাই মনে করছে হোয়াইট হাউজ। বিষয়টি জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে জবাব আশা করছে ওয়াশিংটন। যদিও এখনো কোনো বিষয় চূড়ান্ত হয়নি, তবে যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো দুই দেশ চুক্তির সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে ও আটকে থাকা কয়েকশ কোটি ডলার অর্থ ছাড় করবে। পাশাপাশি উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হবে।
তবে এই সমঝোতা স্মারকের অনেক শর্তই চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে যুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও ভবিষ্যতে আবার সংঘাত শুরু হওয়ার বা দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এমনকি সম্মুখযুদ্ধ থেমে গেলেও স্থায়ী সমাধান নাও আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউজ মনে করে, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব একাধিক অংশে বিভক্ত। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলা কঠিন হতে পারে। এমনকি প্রাথমিকভাবে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়েও কিছু মার্কিন কর্মকর্তা সংশয় প্রকাশ করেন।
এর আগে বিভিন্ন আলোচনা এবং চলমান যুদ্ধের সময়ও মার্কিন কর্মকর্তারা একাধিকবার চুক্তির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
তবে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানের ঘোষণা থেকে সরে এসেছেন। আলোচনায় অগ্রগতির কারণেই তিনি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
পর্দার আড়ালের তথ্য অনুযায়ী, এক পৃষ্ঠার এই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক নিয়ে বর্তমানে দরকষাকষি চলছে। ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার সরাসরি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমান খসড়া অনুযায়ী, এই সমঝোতার মাধ্যমে প্রথমে অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করা হবে। এরপর শুরু হবে ৩০ দিনের নিবিড় আলোচনা। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বিস্তারিত চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, এ আলোচনা পাকিস্তানের ইসলামাবাদ বা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে পারে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই ৩০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আরোপিত বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ তুলে নেওয়া হবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার অবরোধ আরোপ করতে পারবে, এমনকি সামরিক পদক্ষেপও নিতে পারে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার সময়সীমা নিয়ে এখনো প্রধান আলোচনা চলছে। তিনটি সূত্র জানিয়েছে, এই মেয়াদ কমপক্ষে ১২ বছর হতে পারে। তবে একটি সূত্র বলছে, এটি ১৫ বছর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে ২০ বছরের দাবিতে অনড় ছিল।
সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে এমন একটি শর্ত রাখতে চায়, যাতে ইরান যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের নিয়ম ভঙ্গ করে, তাহলে স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বাড়বে। আর এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে।
সমঝোতা স্মারকে ইরান অঙ্গীকার করবে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না ও এ সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমেও জড়াবে না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান যেন কোনো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা না করে, সে বিষয়েও একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা চলছে।
এছাড়া ইরান কঠোর তদারকি ব্যবস্থার আওতায় থাকতে রাজি হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ফলে জাতিসংঘের পরিদর্শকরা যে কোনো সময় ইরানের স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক পরিদর্শন করতে পারবেন।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে ও বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা শত শত কোটি ডলার অর্থ পর্যায়ক্রমে অবমুক্ত করবে।
দুটি সূত্রের দাবি, ইরান তাদের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নিতে রাজি হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল। যদিও এত দিন তেহরান এ বিষয়ে রাজি ছিল না। একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।









