থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ৭১ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রোববার গভীর রাতে জনপ্রিয় চাতুচাক জেলার ‘রং বিয়ার না লাত ফ্রাও’ বারে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঞ্চের কাছাকাছি অংশে আগুনের সূত্রপাত হয়।
মুহূর্তের মধ্যেই তা পুরো বারে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ধোঁয়ায় ভরে যায় পুরো কক্ষ।আতঙ্কিত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কেউ কেউ শরীরে আগুন নিয়েই বার থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন।
রাত ১২টার কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন দমকলকর্মীরা। পরে তারা বারের একটি বাথরুম থেকে অধিকাংশ মরদেহ উদ্ধার করেন। ধারণা করা হচ্ছে, আতঙ্কে অনেকেই সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
থাইল্যান্ডের জাতীয় পুলিশপ্রধান কিত্রাত পানফেত বলেন, নিহতদের বেশিরভাগকে টয়লেটে পাওয়া গেছে। আগুন লাগার পর তারা আতঙ্কিত হয়ে সেখানে ছুটে যান। তখন কোনো আলোও ছিল না।
২৪ বছর বয়সী লাওসের নাগরিক কেও-উদন পুংপানই তার ছোট ভাইকে হারিয়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিয়ে দরজায় স্প্রে করেছিলাম, কিন্তু আর ভেতরে যেতে পারিনি। শুধু মানুষের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম।’
আরেক নারী বেঁচে যান মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে। উসা তাদস্রি (৪১) ধূমপানের জন্য বাইরে বের হওয়ার পরপরই বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনতে পান। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো। এরপর আর বের হওয়ার কোনো পথ ছিল না।’
কিছুক্ষণ আগেও যার সঙ্গে বসে গান শুনছিলেন, সেই বন্ধুর মরদেহ উদ্ধার করতে দেখার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন উসা তাদস্রি। তিনি বলেন, ‘আমার মাথা কাজ করছিল না। মনে হচ্ছিল, সে যেন শুধু ঘুমিয়ে আছে।’
ব্যাংককের দুর্যোগ প্রশমন বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, এয়ার কন্ডিশনারে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে এখনো আগুন লাগার আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বলেন, আগুন লাগার সময় মঞ্চে গান গাওয়া এক শিল্পী তাকে জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের মতো শব্দ হওয়ার পর সবাই ধোঁয়া ও আগুন থেকে বাঁচতে দৌড়াতে শুরু করেন।
শিল্পীর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেকেই ভবনের পেছনের দিকে গিয়ে বাথরুমে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখান থেকেই আর বের হতে পারেননি।
দমকল বিভাগ জানায়, এক পথচারী চালকের ফোন পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সোমবার সন্ধ্যার সর্বশেষ তথ্যে জানানো হয়েছে, আহতদের মধ্যে ২৫ জন আশঙ্কাজনক, ১৪ জন মাঝারি মাত্রায় আহত এবং ৩২ জন সামান্য আহত। বারের মালিকও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
ব্যাংককের দুর্যোগ প্রশমন বিভাগের পরিচালক সুরিয়াচাই রাভিওয়ান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে।
ব্যাংককের গভর্নর চাচার্ট সিত্তিপুন্ট বলেন, বারের ছাদে ব্যবহৃত দাহ্য সাজসজ্জার উপকরণ আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে।
তিনি আরও জানান, জরুরি নির্গমন পথের কাছেও কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, বের হওয়ার পথে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। তবে ফরেনসিক তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
মোটরসাইকেল আরোহী সুরিন জাইহার্ন জানান, তিনি নিজের পোশাক ব্যবহার করে শরীরে আগুন লেগে যাওয়া অন্তত পাঁচজনকে উদ্ধার করতে সহায়তা করেন।
তিনি বলেন, ‘খুব খারাপ লাগছে। এত মানুষের মৃত্যু দেখেছি। যাদের উদ্ধার করেছি, তাদের শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে তাও জানি না।’
অগ্নিকাণ্ডের খবর দেওয়া ওই চালক থাই সংবাদমাধ্যম ডেইলি নিউজকে জানান, তিনি জানালা ভেঙে অন্তত দুজনকে বের হতে সহায়তা করেছিলেন।
সোমবার সকাল থেকে বারটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ভাঙা কাচ ও আসবাবপত্র ভবনের বাইরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ঘটনাস্থলের বাইরে সারিবদ্ধভাবে রাখা মরদেহের ব্যাগের ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
ভেতরে দেখা গেছে, আগুনে আসবাব, দেয়াল ও ছাদ পুরোপুরি কালো হয়ে গেছে। ছাদের কিছু অংশও খসে পড়েছে। সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, তখনও বাতাসে পোড়া গন্ধ ভাসছিল।
চাতুচাক জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে ভবনটি ৩০ দিনের জন্য বন্ধ রাখা হবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারকে ২৯ হাজার ৩০০ থাই বাত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রত্যেক আহতকে ৪ হাজার থাই বাত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
থাইল্যান্ডে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালে ব্যাংককের দক্ষিণের একটি বারে আগুন লেগে ২২ জন নিহত হন। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ব্যাংককের একটি নাইটক্লাবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬৬ জনের মৃত্যু এবং ২০০ জনের বেশি আহত হন। এছাড়া ২০২৪ সালে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট আগুনে বিখ্যাত উন্মুক্ত চাতুচাক মার্কেটে প্রায় এক হাজার প্রাণী মারা যায়।









