দুই দিনে অতিভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বাম তীরের জেলা লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলে স্বল্প মেয়াদি বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৮ মিটার। যা বিপৎসীমার (৫২ দশমিক ১৫ মিটার) ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উজানে ভারতে কয়েকদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত দুই দিনের অতি ভারী বৃষ্টি।
অতিভারী বৃষ্টি আর উজানের এ ঢলের কারণে বাংলাদেশ অংশের ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত মাসের শেষ দিকে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্বল্প মেয়াদি বন্যার সৃষ্টি হয়।যা একদিন পরে উন্নতি ঘটে। এরপর বুধবার থেকে পানি বাড়া শুরু হলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিপৎসীমার কাছে চলে আসে এবং চলতি মৌসুমে দ্বিতীয় বন্যার কবলে পড়ে তিস্তাপাড়ের মানুষ। সেই বন্যা পরিস্থিতিও একদিন পরে উন্নতি ঘটে।
গত রোববার রাতে শুরু হওয়া অতিভারী বৃষ্টি সোমবার দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। উজানের ঢলের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে আবারও বৃদ্ধি পায় তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ। সোমবার (১৩ জুলাই) দিনভর পানি প্রবাহ বেড়ে সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে। ফলে তিস্তার উভয় তীরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে তিস্তা চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। জেলার ৫টি উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকার নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় নৌকা আর ভেলা হয়েছে যোগাযোগের মাধ্যম।
পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নদী তীরবর্তী এলাকার উঁচু রাস্তাগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দীর্ঘ সংস্কার না করা এসব বাঁধ চলতি বন্যায় বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব নিয়ে কাজ না করে ফেলে রাখে। বর্ষা এলে এসবে জরুরি মেরামত দেখিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা লোপাট করে। অথচ শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ মেরামত করলে কাজগুলো যেমন পাকাপোক্ত হবে, তেমনি নদী ভাঙন আর বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পেত।
গোবর্দ্ধন গ্রামের আব্দুল হামিজ বলেন, দুপুর থেকে পানি বাড়তে শুরু করেছে। ক্রমেই বেড়ে চলেছে তিস্তা নদীর পানি। ইতোমধ্যে চরাঞ্চলের বেশ কিছু বাড়িতে পানি উঠেছে। পানির চাপ দেখে মনে হচ্ছে বড় বন্যা হতে পারে। বড় বন্যা হলে দীর্ঘদিন সংস্কার না করা বাঁধগুলো ভেঙে যেতে পারে। এমন হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে। বন্যার সময় নদীপাড়ের মানুষরা আমরা নির্ঘুম রাত কাটাই। চারদিকে পানি আর পানি।
নদীপাড়ের শৈলমারী চরের আব্দুল গফুর বলেন, উজানের ঢলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত দুইদিনের অতিভারী বৃষ্টি। ফলে তিস্তাপাড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। জন্মলগ্ন থেকে তিস্তা নদী খনন না করায় তলদেশ ভরাট হয়েছে। যার কারণে সামান্য পানি বাড়লেই বন্যা হয়। পানিতে ডুবে যায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি। আমরা চাই দ্রুত সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে তিস্তাপাড়ের দুঃখ লাঘব করুক।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, বৃষ্টিপাত আর উজানের পানি প্রবাহ অব্যাহত থাকায় পানি বেড়েছে তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে। এ কারণে নদী তীরবর্তী এলাকার নিম্নাঞ্চলে স্বল্প মেয়াদি হালকা বন্য দেখা দিতে পারে। বন্যা সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনিল কুমার বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে সোমবার দুপুর থেকে তিস্তা নদীতে পানি প্রবাহ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। তাই স্বল্প মেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের মানুষদের সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে।









