‘এটা সত্যিই ভীতিকর’: গ্রিন কার্ড নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নির্দেশনায় বিভ্রান্তি, উদ্বেগ

গ্রিন কার্ড নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া সাম্প্রতিক নির্দেশনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নীতির ব্যাখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেক আবেদনকারী ও তাদের পরিবার।
তাদের মধ্যে একটি গবেষণা বিজ্ঞানী ফ্রান্সিসকো ও জুলিয়া দম্পতি। তাদের পরিচয় হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্টার্কটিকায় কাজ করার সময়। দ্রুত তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তারা প্রায়ই একে অপরের বাড়িতে যেতেন। ফ্রান্সিসকোর বাড়ি চিলিতে এবং জুলিয়ার বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে। খবর সিএনএন এর উপর

গত গ্রীষ্মে ফ্রান্সিসকো জুলিয়ার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পর তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্ব সহকারে পরিকল্পনা শুরু করেন। ফ্রান্সিসকো বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি জীবনের বাকি সময় একসঙ্গে কাটাব।’

পরে তারা বিয়ে করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজের অনুমতি পেতে ফ্রান্সিসকো গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করেন। আইনজীবীদের পরামর্শ অনুযায়ী, তিনি চিলিতে ফিরে না গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই অভিবাসন মর্যাদা পরিবর্তনের আবেদন করেন। কিন্তু গ্রিন কার্ড নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক নীতিগত নির্দেশনা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। চলতি বছরের শেষ দিকে জুলিয়ার যমজ সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা রয়েছে।

‘দুই নবজাতককে নিয়ে হয়তো আমাকে একা থাকতে হবে’ গত সপ্তাহে ঘোষিত এক নির্দেশনায় বলা হয়, স্থায়ী বসবাসের অনুমতিপ্রত্যাশী অধিকাংশ আবেদনকারীকে পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজ দেশে অপেক্ষা করতে হতে পারে।

কিন্তু এই ঘোষণার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, এটি মূলত ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেসের (ইউএসসিআইএস) কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিদ্যমান বিবেচনাধিকার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য জারি করা হয়েছে।

জুলিয়া বলেন, ‘পূর্বের নীতির ভিত্তিতে আমরা পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এখন সেই নীতি পরিবর্তন করা হয়েছে। যদি আমাদের ক্ষেত্রেও নতুন নীতি প্রযোজ্য হয়, তাহলে পূর্ণকালীন চাকরি সামলে আমাকে হয়তো একাই দুই নবজাতককে দেখাশোনা করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে ছোট শিশুদের আলাদা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কল্পনা করাও আমার জন্য আতঙ্কের ব্যাপার।’ নীতিটি ঘোষণার সময় ইউএসসিআইএস জানায়, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা আরও ‘ন্যায্য ও কার্যকর’ হবে। একই সঙ্গে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে অভিবাসীরা অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে।

তবে নীতির প্রাথমিক ঘোষণাটি মূল নীতির তুলনায় আরও কঠোর মনে হয়েছে। সেখানে বলা হয়, শুধুমাত্র ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু কী ধরনের পরিস্থিতিকে ব্যতিক্রমী বলা হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, পরিবর্তনগুলোর প্রকৃত প্রভাব এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। তাদের মতে, এটি আইনের পরিবর্তন নয়, বরং নীতিগত পরিবর্তন এবং আদালতে এর বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

আটলান্টাভিত্তিক অভিবাসন আইনজীবী চার্লস কুক বলেন, ‘আমি ব্যাপকহারে আবেদন প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা করছি না। তাছাড়া এই নীতি পূর্ববর্তী আবেদনগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব আবেদনকারীকে নতুন করে নিজ দেশে ফিরে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হলে কোনো আদালত তা সমর্থন করবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার মক্কেলদের বলছি, শান্ত থাকুন, পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় তা দেখুন, আইনজীবীর পরামর্শ মেনে চলুন। সবকিছু ঠিক থাকবে।’ যদিও ইউএসসিআইএস ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ প্রক্রিয়াকে একটি ‘ফাঁকফোকর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, বাস্তবে এটি কংগ্রেস প্রণীত আইনের অংশ। প্রশাসনিক নীতির মাধ্যমে একতরফাভাবে এটি বাতিল করা সম্ভব নয়।

চার্লস কুক বলেন, ‘কংগ্রেস যখন কোনো আইনকে ২০ বার সংশোধন ও যুগপোযোগী করে, তখন সেটিকে ফাঁকফোকর বলা কঠিন। ইউএসসিআইএস তাদের ঘোষণায় সেটিই করেছে। এটি আইন, এবং আইন অনুযায়ী যোগ্য ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেই অভিবাসন মর্যাদা পরিবর্তনের সুযোগ পাবেন।’

ইউএসসিআইএসের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই এই নীতির কিছু অংশ প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিএনএনের হাতে আসা একটি অপেক্ষমাণ অভিবাসন মর্যাদা পরিবর্তন-সংক্রান্ত মামলার নথিতে দেখা গেছে, আবেদনকারীদের কাছে পরিবারের সম্ভাব্য দুর্ভোগ, সমাজে অবদান এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

ব্যাপক বিভ্রান্তি
অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে এই নীতি নিয়ে দেওয়া সরকারি নির্দেশনা লাখো অভিবাসীর মধ্যে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অপেক্ষমাণ আবেদনকারী এবং গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করার কথা ভাবছেন এমন ব্যক্তিরাও।

কয়েকজন অভিবাসন আইনজীবীর মতে, সম্ভবত এটাই ছিল উদ্দেশ্য। অভিবাসন আইনজীবী জিম হ্যাকিং বলেন, ‘তারা চায় মানুষ ভয় পাক এবং স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাক।’ বিশ্লেষকদের মতে, এটি বৈধ অভিবাসনের পথ সংকুচিত করতে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ। এর মধ্যে রয়েছে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন কমানো, টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস কর্মসূচি সীমিত করা, শরণার্থী গ্রহণ কার্যত বন্ধ করা এবং কর্মসংস্থান ও শিক্ষার্থী ভিসায় কড়াকড়ি আরোপ।

ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও চাকোন সেন্টার ফর ইমিগ্র্যান্ট জাস্টিসের পরিচালক মওরিন সুইনি বলেন, এটি কেবল অভিবাসনব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নয়, বরং একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ। এসব সমালোচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ অভিবাসন সীমিত করার এসব পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে উচ্চযোগ্যতাসম্পন্ন বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে। প্রযুক্তি খাতের কর্মীরাও নতুন গ্রিন কার্ড নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

পিএইচডিধারী এবং নিজ নিজ কমিউনিটিতে সক্রিয় ফ্রান্সিসকো ও জুলিয়াও এই মেধাপ্রবাহের ক্ষতির নতুন উদাহরণ হতে পারেন। ফ্রান্সিসকো ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও(ইইউ) নাগরিক। ফলে এই দম্পতি এখন বিকল্প গন্তব্যের কথা ভাবছেন। জুলিয়া বলেন, ‘আমাদের সামনে বিকল্প আছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রে থেকে দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু যদি সেটি সম্ভব না হয়, তাহলে অন্য দেশগুলোর শ্রমবাজারেও আমরা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে আছি। সে ক্ষেত্রে পরিবার নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।’

  • Related Posts

    আন্তঃদেশীয় হুমকি মোকাবিলায় আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান উদীয়মান ও আন্তঃদেশীয় হুমকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে আসিয়ান এবং এর অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ব্যাপারে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব…

    Continue reading
    ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

    বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শুক্রবার (২৪ জুলাই) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের…

    Continue reading

    আন্তঃদেশীয় হুমকি মোকাবিলায় আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ

    আন্তঃদেশীয় হুমকি মোকাবিলায় আসিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ

    ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

    ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

    স্পেনে ভয়াবহ দাবানল, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা

    স্পেনে ভয়াবহ দাবানল, জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা

    শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া কোনো আলোচনা নয়: রাহুল গান্ধী

    শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া কোনো আলোচনা নয়: রাহুল গান্ধী

    ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে কোনো আপস নয়’, কেন্দ্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকেও অনড় সিজেপি

    ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে কোনো আপস নয়’, কেন্দ্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকেও অনড় সিজেপি

    মোদীর আশ্বাসে থামছে না আন্দোলনকারীরা, কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

    মোদীর আশ্বাসে থামছে না আন্দোলনকারীরা, কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা

    কিশোরগঞ্জে বাস-মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ১

    কিশোরগঞ্জে বাস-মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ১

    আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি

    আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি

    ভারতে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে বার্তা দিলেন টেন্ডুলকার

    ভারতে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে বার্তা দিলেন টেন্ডুলকার

    ভেনিস উৎসবে বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’

    ভেনিস উৎসবে বাংলাদেশের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’