ধরলা নদীতে নৌকাবাইচ। বিকেল হলেই মিলিত ধ্বনি তুলে জলের ওপর ছুটে চলে বাইচের নৌকা।
বাইচ দেখতে দুই পারে মানুষের ঢল। নানা বয়সী মানুষ। কেউ নদীর পারে দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায় কিংবা আশপাশের উঁচু স্থানে। সবার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নে ধরলা নদীতে ঐতিহ্যের এই নৌকাবাইচ চলছে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে। স্থানীয়দের উদ্যোগে আয়োজিত বাইচ উদ্বোধন করা হয় গত ২৬ আগস্ট। উদ্বোধনী দিন থেকে দূর-দূরান্তের ১২টি বড় নৌকাসহ বাইচে অংশ নিচ্ছেন বাইচালরা।
অনুষ্ঠিত হয় সেমিফাইনাল।
এতে বিজয়ী হয় উলিপুর থেকে আসা তামিম বাংলা এবং হক বাজার এলাকার দাদাভাই নামের দুই নৌকা।
রবি, সোম ও মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বাইচ দেখতে ধরলা নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর নির্বিশেষে নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতি আয়োজনকে পরিণত করেছে উৎসবে। বাইচ শুরু হলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রতিযোগী নৌকাগুলো বৈঠায় জল কেটে কেটে দ্রুতগতিতে ছুটছে।
তাদের উৎসাহ দিতে চলছে দর্শকের তুমুল করতালি; চিৎকার করে ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে উচ্ছ্বাসপূর্ণ ধ্বনি।
নদীমাতৃক এই দেশের নানা এলাকায় নিয়মিত নৌকাবাইচ হতো একসময়। এমন আয়োজন এখন অনেক কম। তাই ধরলা নদীতে এ আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
আয়োজকরা জানান, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং মানুষের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।
এদিকে নৌকাবাইচ ঘিরে ধরলা নদীর পারে বসেছে মেলা। সড়ক থেকে ধরলা সেতু পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দর্শনার্থীর ঢল নামে।
নৌকাবাইচ দেখতে আসা অসীম কুমার রায়, ববিতা খাতুন ও রুবিন খাতুন জানান, তারা প্রত্যেকেই প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর থেকে বাইচ দেখতে এসেছেন।
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলাটি সত্যিই আনন্দদায়ক। খেলা দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড় দেখে আমি মুগ্ধ। নদীর ঢেউয়ের মতো এ বাইচ মানুষের মনকে নির্মল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যবাহী ধারা ধরে রাখার এ আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।
নৌকাবাইচ দেখতে আসা কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিক বলেন, আমাদের ইউনিয়নে তেমন কোনো জলাশয় না থাকায় নৌকাবাইচ দেখার সুযোগ খুব একটা হয় না। তাই এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি আমার অত্যন্ত প্রিয়। প্রতিবছর ধরলাপারে টানা কয়েকদিনের বাইচ উপভোগ করি।
নৌকাবাইচ কমিটির উপদেষ্টা ও খেলা পরিচালনাকারী শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল এবং উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা সামছুজ্জামান হাসু বলেন, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা। এ ধরনের আয়োজন দেশের প্রত্যেক এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হলে তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে।
আয়োজকরা জানান, দু-এক দিনের মধ্যে বাইচের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর ধরলা নদীর তীরে নিয়মিত নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে বলে জানান তারা।









