ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ নম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসন থেকে দেশের সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ান। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে ৩ মাসের মাথায় এসে পদত্যাগ করেন দীপেন দেওয়ান। এ নিয়ে রাঙ্গামাটিতে শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড়।
সোমবার (১ জুন) তিনি প্রধানমন্ত্রী বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন।
যদিও পদত্যাগপত্রে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আলোচনার জন্ম হয়েছে। হঠাৎ করে সরকারের একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন পাহাড়ের মানুষ। দলীয় নেতাকর্মীরাও বলছেন, নীতি আদর্শ আর দীপেনের সারল্যের কথা!
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ প্রসঙ্গে জানতে সোমবার দুপুরে থেকে একাধিকবার তার মোবাইলে কল দিয়ে সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি। পদত্যাগপত্রে ‘শারীরিক অসুস্থতা’ লেখা হলেও পদত্যাগের পেছনে ‘ভিন্ন কারণ’ খুঁজছেন পাহাড়ের মানুষ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা।
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুপ্রিয় চাকমা তার ফেসবুকে লেখেন, ‘স্যালুট পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী। সব সিদ্ধান্ত যদি বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয় তাহলে সেই চেয়ারে না থাকাই উত্তম।’
রাঙ্গামাটি পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠজন বিএনপি নেতা হেলাল উদ্দীন লিখেন, রাজনীতিতে আবেগ আর জেদের চেয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই প্রকৃত নেতার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। দীপেন দেওয়ান তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি ক্ষমতার মোহে অন্ধ নন, বরং জনগণের পালস এবং সময়ের দাবি বুঝতে পারেন। একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে না থেকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী। রাজনীতিতে কখনো কখনো এক পা পিছিয়ে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয় বরং বৃহত্তর স্বার্থে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করা। দীপেন দেওয়ানের এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। দল-মত নির্বিশেষে এ সিদ্ধান্ত আগামী দিনে আমাদের অঞ্চলের রাজনীতিতে এক নতুন ইতিবাচক ধারা তৈরি করবে বলে বিশ্বাস করি। সময়ের ডাক যারা শুনতে পায়, ইতিহাস তাদের পথ দেখায়। আপনার পরবর্তী রাজনৈতিক যাত্রার জন্য শুভকামনা, দীপেন দা।’
এদিকে, পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের প্রচার বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা লিখেন, ‘স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে? তার এমন সিদ্ধান্ত কী নিছক স্বাস্থ্যগত কারণে নাকি তাকে কৌশলে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পর তিনি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে ‘সুখবর আসার’কথা বলেছিলেন। অনেকে তার কথায় খুশিতে গদগদ হয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুখবরের পরিবর্তে আজ তার পদত্যাগের খবর আসলো কেন? পদত্যাগের কারণে তাকে অনেকে বাহবা দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি যে নিজের ইচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মোট কথা তাকে মন্ত্রী থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এখন দীপেন দেওয়ানের বদলে কাকে পার্বত্য মন্ত্রী বানানো হয় তা দেখার বিষয়। তবে বিএনপি সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি যে সুখকর হবে না তা বলাই বাহুল্য।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক ও উন্নয়নকর্মী অশোক কুমার চাকমা লিখেন, স্বাস্থ্যগত কারণটি বোধহয় প্রধান কারণ নয়। স্বাস্থ্য নয়, স্বাস্থ্যের ভেতর ‘আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন’ আরও একটি সত্ত্বা আছে, মনে হয় সেখানে আঘাত পড়েছে।’
উন্নয়নকর্মী ও দীপেন দেওয়ানের এলাকার (মন্ত্রী পাড়া) বাসিন্দা ঝিমি চাকমা লিখেছেন, ‘এরকম সাহস কেউ দেখাতে পারেনি। পদলেহন করেও চেয়ার আঁকড়ে ধরে থাকাটাই এদেশে স্বাভাবিক।’
এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারদলীয় রাজনৈতি নেতাকর্মী, সংবাদকর্মী, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিককর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে নানারকম প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।









