- ছায়ানটের অনুষ্ঠান ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তা, থাকছে আলাদা প্রবেশপথ
- বৈশাখী শোভাযাত্রা ও রমনা এলাকা জুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা
- ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল, ড্রোন—বৈশাখে পূর্ণ প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
- সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ সব অনুষ্ঠান, নিরাপত্তায় কঠোর নির্দেশনা
- গুজব ঠেকাতে সাইবার নজরদারি, মাঠে থাকবে সাদা পোশাকের টিম
দুই যুগেরও আগের ঘটনা। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। দিনটি ছিল বাংলার মানুষের নতুন বছর ১৪০৮ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নেওয়ার দিন। সকাল থেকেই চলছিল নতুন বছরকে বরণের সব আয়োজন। ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে চলছিল বর্ষবরণ। সকালবেলায় হাজারো মানুষ যখন গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করছিল, তখন হঠাৎ ঘটে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ।
ওই হামলায় প্রাণ হারানো ও আহতের তালিকাও ছিল বেশ বড়। তদন্তে জানা যায়, এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল উগ্রপন্থি সংগঠন ‘হরকাত-উল-জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ’ বা হুজি। এই ঘটনা দেশের ইতিহাসে একটি বড় সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত, যা দেশের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
ওই ঘটনার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। প্রতিবারের মতো এবারও রাজধানীর রমনা বটমূলে বর্ষবরণ ঘিরে থাকছে কড়া নিরাপত্তা।
দুই যুগ আগের রমনা বটমূলে বোমা হামলার ভয়াবহতার স্মৃতি মাথায় রেখেই রমনা বটমূলে এবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপন ঘিরে নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সম্ভাব্য যে কোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে র্যাবের হেলিকপ্টার, পাশাপাশি ইউনিফর্মধারী সদস্যদের ফুট পেট্রোল ও টহলকে ভাগ করে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, নববর্ষ ঘিরে নির্দিষ্ট কোনো হামলার শঙ্কা না থাকলেও সতর্কতায় কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য জারি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, র্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন নির্দেশনা ও নিষেধাজ্ঞা। এর সঙ্গে প্রস্তুত থাকছে ফায়ার সার্ভিসের টিম এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও থাকবে সার্বক্ষণিক সক্রিয়। এদিকে রমনার বটমূলে নিরাপত্তা নিশ্চিতের এই প্রস্তুতির সরেজমিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ তোড়জোড় ভূমিকাও দেখা গেছে।
রোববার (১২ এপ্রিল) সরেজমিনে রমনা বটমূল ঘুরে দেখা গেছে, পুরো বটমূল এলাকা নিরাপত্তা চাদরে ঘিরে ফেলা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থল ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত সিসিটিভি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চারদিকে রাখা হয়েছে নজরদারির ব্যবস্থা। বাঁশ দিয়ে ঘেরা হয়েছে অনুষ্ঠানস্থল। চারদিকে রয়েছে র্যাবের ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা। রয়েছে কন্ট্রোল রুমসহ প্রাথমিক অসুস্থতায় চিকিৎসা দানের ব্যবস্থাও।
বর্ষবরণ উপলক্ষে রমনার বটমূল ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়ে রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে বটমূলে নিরাপত্তা মহড়া পরিদর্শন করেন ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সারোয়ার।
তিনি বলেন, ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিপুল মানুষের সমাগম হবে। যেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারে, সেজন্য ডিএমপি ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
নববর্ষের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো ঢাকা মহানগরীকে ৯টি সেক্টর ও ১৪টি সাব-সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল টিম দিয়ে সুইপিং করা হবে।
কমিশনার আরও বলেন, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪টি স্থানে ব্যারিকেড বসানো হবে। প্রতিটি প্রবেশপথে আর্চওয়ে ও হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি করা হবে।
তিনি আরও জানান, সিসিটিভি, ভিডিও ক্যামেরা, স্টিল ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও রুফটপে বিশেষ ফোর্স মোতায়েন থাকবে।
ইভটিজিং ও অপরাধ দমনে বিশেষ টিম
ইভটিজিং, ছিনতাই ও পকেটমার প্রতিরোধে সাদা পোশাকে বিশেষ টিম কাজ করবে। এছাড়া হকারদের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকাতেও থাকবে আলাদা নজরদারি। সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার বা গুজব ঠেকাতে সাইবার পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
ছায়ানটের অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রায় বিশেষ ব্যবস্থা
রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সকাল ৬টা ১৫ মিনিট থেকে ৮টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত চলবে। নির্ধারিত কয়েকটি গেট দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকবে এবং নারী-পুরুষ ও শিল্পীদের জন্য আলাদা গেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার উদ্যোগে সকাল ৯টায় শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা, যা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর হয়ে আবার চারুকলায় এসে শেষ হবে। শোভাযাত্রার পুরো রুট থাকবে কঠোর নিরাপত্তার আওতায়। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। বিকেল ৫টার পর রমনা পার্কের সব গেট শুধু বের হওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। ৬টার পর আর কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
ট্রাফিক ডাইভারশন
পহেলা বৈশাখে ভোর ৫টা থেকে শাহবাগ ও আশপাশ এলাকায় যান চলাচলে ডাইভারশন দেওয়া হবে। বাংলামোটর, কাকরাইল, হাইকোর্ট, নীলক্ষেতসহ ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যারিকেড থাকবে। যাত্রীদের বিকল্প সড়ক ব্যবহার করার অনুরোধ জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার।
পার্কিং ও জরুরি সেবা
নির্ধারিত কয়েকটি স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, মেডিক্যাল টিম, নৌ-পুলিশের ডুবুরি দল প্রস্তুত থাকবে। ডিএমপি কমিশনার নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করুন। কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ বা ডিএমপি কন্ট্রোল রুমে জানান।
বৈশাখ ঘিরে হুমকি আছে কি না জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, কোনো হুমকি নেই। আমাদের জোর প্রস্তুতি আছে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্যে।
কমিশনার বলেন, রমনা পার্ক ও আশপাশের এলাকায় কোনো ধরনের মুখোশ, ব্যাগ, ধারালো বস্তু ও দাহ্য পদার্থ বহন ফানুস, আতশবাজি এবং শব্দ দূষণ সৃষ্টি করে এমন বাঁশি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, সামগ্রিকভাবে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমাদের ডিজি ঢাকাসহ সারাদেশে যতগুলো র্যাবের ব্যাটালিয়ন আছে সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। পহেলা বৈশাখ ঘিরে দেশের প্রতিটি জেলায় বড় বড় আয়োজনগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাবের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটা হয় রমনার বটমূলে। এখানে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি শুরু হয়ে গেছে। এই এলাকা এবং আশেপাশের এলাকা ঘিরে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। পাশাপাশি নববর্ষের দিন আমাদের ইউনিফর্মে ফুট পেট্রোল এবং টহলগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একভাগে আছে মোটরসাইকেল আরোহী। প্রত্যেক মোটরসাইকেলে দুইজন করে র্যাব সদস্য থাকবেন। বাকি আরেকটি যে গ্রুপ আছে সেই গ্রুপের মধ্যে আমাদের টহল পিকআপ আছে। প্রত্যেকটি পিকআপে আটজন করে র্যাব সদস্য থাকবেন।
‘দিনব্যাপী এটা চলতে থাকবে। এর পাশাপাশি আমাদের ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছে, কন্ট্রোল রুম বসানো হয়েছে, কন্ট্রোল রুম থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং চলবে। ওয়াচ টাওয়ারে আমাদের সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন। তারা ওখান থেকে মনিটরিং করবেন।’
র্যাবের মুখপাত্র বলেন, অনুষ্ঠানস্থলের পেছনে লেক এরিয়ায়ও র্যাব সদস্যরা নিরবচ্ছিন্নভাবে নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়াও বোম্ব ডিসপোজাল এবং ডগ স্কোয়াড এখানে সুইপিংয়ের কাজ করবে। পাশাপাশি কোনো ধরনের অপচেষ্টা চালানো হলে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে, তাহলে আমাদের হেলিকপ্টারগুলোকে স্ট্যান্ডবাই রেখেছি। যদি কোনো ইমিডিয়েটলি মেডিপ্যাকের প্রয়োজন পড়ে তাহলে নিকটস্থ খোলা মাঠে অবতরণের মাধ্যমে আমরা মেডিপ্যাকের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবো।
‘আপনারা জানেন, ধর্মীয় অথবা সাংস্কৃতিক এ ধরনের বড় অনুষ্ঠানগুলো হলে এর আগে পরে বিভিন্ন ধরনের সাইবার বুলিং ও রিউমার প্রপাগান্ডা ছড়ানোর একটা অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। যেহেতু আমরা এই জিনিসটা অবজারভ করি, তাই আমাদের পক্ষ থেকে আমরা অলরেডি সাইবার অনলাইন মনিটরিং শুরু করে দিয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চটা দিয়ে জনগণের পাশে থাকার ও নিরাপত্তা সেবা নিশ্চিত করার। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, কোনো ধরনের অপচেষ্টা বা অপতৎপরতার কোনোরকম সম্ভাবনা নেই। আমরা আশা করছি ইনশা আল্লাহ এবারের উৎসব খুবই আনন্দঘন পরিবেশে সবাই উপভোগ করতে পারবে।’
কার্যপত্রে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়, সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে অপপ্রচার রোধে পুলিশ সদর দপ্তর, র্যাব, এসবি ও সিআইডিকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হবে। ৩০০ ফিট এলাকায় কার ও মোটরসাইকেল রেসিং বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান রাত ১০টার মধ্যে শেষ করার কথাও বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে।










