মুসলিম ব্রাদারহুডের কয়েকটি শাখাকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ তকমা দিতে যাচ্ছেন ট্রাম্প

মুসলিম ব্রাদারহুডের (এমবি) কিছু শাখাকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন বা ফরেন টেররিস্ট অর্গানাইজেশন বা এফটিও হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার এই বিষয়ে এক নির্বাহী আদেশে সই করেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, ‘এই আদেশের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের নির্দিষ্ট চ্যাপ্টার/অধ্যায়/শাখা বা উপশাখাগুলোকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হলো।’ এতে লেবানন, মিসর ও জর্ডানে মুসলিম ব্রাদারহুডের শাখাগুলোকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

আদেশে আরও বলা হয়, এসব শাখা ‘নিজেদের অঞ্চলে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দিতে জড়িত কিংবা এসব কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ ও সমর্থন দেয়, যা তাদের নিজ অঞ্চলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হানিকর।’ কিছুদিন আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডকে এফটিও হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘এটি হবে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কঠোর ভাষায় করা ঘোষণা। চূড়ান্ত নথিগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে।’ মার্কিন কংগ্রেস যখন মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার দিকে যাচ্ছে, ঠিক তার আগেই ট্রাম্প এই নির্বাহী আদেশ জারি করলেন।

রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার একটি বিল এগিয়ে নিচ্ছেন। রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যানও এতে সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসেও একটি বিল আনা হয়েছে, যাতে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের মধ্যে জ্যারেড মস্কোভিটস, থমাস সুওজি ও জন গটহেইমারসহ চারজন সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে আছেন।

তবে মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার জন্য ট্রাম্পের নতুন আইন দরকার নেই। কারণ, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী এই ক্ষমতা ইতিমধ্যেই তাঁর রয়েছে। আইন অনুযায়ী সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নির্ধারিত মানদণ্ড হলো, সংগঠনটি বিদেশি হতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও নাগরিকদের জন্য ক্ষতিকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকতে হবে।

কোন ক্ষেত্রে মুসলিম ব্রাদারহুড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি—এমন এক প্রশ্নের জবাবে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাথান ব্রাউন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘একেবারেই নয়।’

প্রেসিডেন্টের হাতে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা আছে নির্বাহী আদেশ ১৩২২৪-এর মাধ্যমে। এই আদেশ অনুযায়ী ট্রেজারি, স্টেট ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্টকে ব্যবহার করে যেসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের সম্পদ জব্দ, নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ-নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আগস্টে বলেন, এফটিও তালিকাভুক্তির কাজ ‘চলমান।’

রুবিও বলেন, ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখা আছে। তাই প্রতিটিকে আলাদা করে তালিকাভুক্ত করতে হবে।’ তিনি বলেন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট বর্তমানে ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখার মূল্যায়ন করছে, যা তাঁর ভাষায় ‘এই পদে না এলে এত জটিল বলে ধারণা করা যায় না।’

মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার এই উদ্যোগ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই শুরু হয়েছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের বসন্তে হোয়াইট হাউসে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প এই প্রচেষ্টায় আরও জোর দেন।

সে সময় তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এই প্রস্তাব সমর্থন করলেও মার্কিন সরকারি আইনজীবী, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মীদের একটি বড় অংশ আপত্তি জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এ মাসের শুরুতে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ঘোষণা করেছেন যে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড ও আমেরিকার মুসলমানদের বৃহত্তম নাগরিক অধিকার সংগঠন কেয়ার-কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক অপরাধী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করছেন। এই ঘোষণার ফলে দুটি সংগঠনই টেক্সাস রাজ্যে জমি কেনা বা অর্জন করতে পারবে না বলে অ্যাবট জানান। এই ঘোষণায় আরও উল্লেখ আছে যে রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস প্রয়োজন অনুযায়ী এই সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। মুসলিম ব্রাদারহুড কী?

আরব বিশ্বে মুসলিম ব্রাদারহুড সবচেয়ে বেশি পরিচিত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে, যা ইসলামি নীতি ও আইনভিত্তিক সংগঠন। ২০১১ সালের আরব বসন্তে স্বৈরশাসকদের পতনের দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর সংগঠনটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়। সংগঠনটি ১৯২০-এর দশকের শেষ দিকে মিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতায়।

পরে মিসরীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের ও সিরিয়ার হাফিজ আল-আসাদের মতো আরব জাতীয়তাবাদী নেতারা সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ও দমন করেন। কিন্তু ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ধর্মনিরপেক্ষ, কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো যখন আধুনিকায়ন ও পশ্চিমা এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে থাকে, তখন ব্রাদারহুড আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এরপর ২০১২ সালে হোসনি মোবারক পতনের পর আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষিত নির্বাচনে মিসর প্রথম মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতায় আনে। সিসি তখন সামরিক গোয়েন্দা প্রধান ও পরে মুরসির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ২০১৩ সালে সিসি একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু করেন।

ব্রাদারহুডকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের গভীর বিরোধ তৈরি হয়। ইউএই ও সৌদি আরব কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে এবং লিবিয়ার মতো দেশে তুরস্কের বিপক্ষে পরোক্ষ যুদ্ধ চালায়। সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কিছুটা মিলমিশ হলেও মুসলিম ব্রাদারহুড বিষয়টি এখনো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেক রাজতান্ত্রিক দেশ সংগঠনটিকে তাদের রাজতান্ত্রিক শাসনক্ষমতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।

তবে মুরসির পতনের পর মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব কমে গেছে, তবে সংগঠনটি এখনো বিভিন্ন স্থানে সমর্থন ধরে রেখেছে। তিউনিসিয়ায় ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ এন-নাহদা পার্টি হয়রানি ও রাজনৈতিক দমনের মুখে পড়েছে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও ইসলামি দুই ধারার বিরোধীদের সরাতে উদ্যোগী হয়েছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা কখনো কখনো এমন সরকারকে সমর্থন দিয়েছে, যাদের মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘনিষ্ঠ দল রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারটি বলা যায়, যেখানে সৌদি-সমর্থিত ইসলাহ দল ঐতিহাসিকভাবে ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

যদি ট্রাম্প মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কাজ এগিয়ে নেন, সংগঠনটি ওয়াশিংটন ডিসির মার্কিন আপিল আদালতে এর বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মুসলিম ব্রাদারহুডের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। বরং বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়, যাদের মধ্যে আদর্শিক মিল থাকলেও সাংগঠনিক কাঠামো ঢিলেঢালা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হামাস মুসলিম ব্রাদারহুড-সংযুক্ত একটি দল, যাকে ১৯৮৭ সালে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকেও যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বর্তমানে মিসর, সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সর্বশেষ জর্ডানে মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ।

  • Related Posts

    মেধানির্ভর জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর: প্রধানমন্ত্রী

    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার মেধানির্ভর, আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল ও দায়িত্ববান মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার…

    Continue reading
    আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তান যাচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও জামাতা

    হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য পাকিস্তানে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেছেন, ইরানিরা আলোচনা করতে…

    Continue reading

    মেধানির্ভর জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর: প্রধানমন্ত্রী

    মেধানির্ভর জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর: প্রধানমন্ত্রী

    আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তান যাচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও জামাতা

    আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তান যাচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত ও জামাতা

    হামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আরও ৩৩ শিশু ভর্তি

    হামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আরও ৩৩ শিশু ভর্তি

    এমবাপেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রিয়াল ও ফ্রান্স

    এমবাপেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রিয়াল ও ফ্রান্স

    মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার: ২৭তম আসরে তারকাখচিত জাঁকালো আয়োজন

    মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার: ২৭তম আসরে তারকাখচিত জাঁকালো আয়োজন

    যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ লিমনের মরদেহ উদ্ধার, সন্ধান চলছে নাহিদার

    যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ লিমনের মরদেহ উদ্ধার, সন্ধান চলছে নাহিদার

    চট্টগ্রামে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত ২১

    চট্টগ্রামে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত ২১

    রাতে পাকিস্তানে যাচ্ছে ইরানের প্রতিনিধি দল, বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা

    রাতে পাকিস্তানে যাচ্ছে ইরানের প্রতিনিধি দল, বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা

    যুদ্ধে সমর্থন পেতে স্পেনকে ন্যাটো থেকে সরানোসহ যা যা করতে চান ট্রাম্প

    যুদ্ধে সমর্থন পেতে স্পেনকে ন্যাটো থেকে সরানোসহ যা যা করতে চান ট্রাম্প

    ইরানের শক্তিশালী ‘জাতীয় ঐক্য’ শত্রুপক্ষের জন্য বড় ‘ধাক্কা’মোজতবা খামেনির বার্তা

    ইরানের শক্তিশালী ‘জাতীয় ঐক্য’ শত্রুপক্ষের জন্য বড় ‘ধাক্কা’মোজতবা খামেনির বার্তা