
ওয়াকফ সংশোধনী বিল ঘিরে বিক্ষোভে উত্তাল ভারতের রাজপথ। প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন দেশটির হাজারো মুসলমান নাগরিক।ধর্মীয় সম্পত্তির ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে কুশপুত্তলিকাও পুড়িয়েছেন তারা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার সংসদে বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাসের পর ভারতের বেশ কয়েকটি শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে।
শুক্রবার (৪ এপ্রিল) জুমার নামাজের পর কলকাতা, চেন্নাই ও আহমেদাবাদের মতো বড় ও ব্যস্তবহুল শহরগুলোতে বিক্ষোভ করেন ভারতীয়রা। এসব বিক্ষোভে ‘ওয়াকফ বিল মানি না, মানব না’ আওয়াজ ওঠে। বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে এখন পর্যন্ত ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় পুলিশ।
সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, ‘যৌথ ওয়াকফ সুরক্ষা মঞ্চ’-এর উদ্যোগে এ বিক্ষোপ কর্মসূচি শুরু হয়। চেন্নাইয়ে তামিল অভিনেতা বিজয়ের রাজনৈতিক দল ‘তামিলগা ভেট্ট্রি কাজাগাম’ এর উদ্যোগে বিক্ষোভে অংশ নেন অনেকে। বিক্ষোভকারীরা বলতে থাকেন, ‘আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না। ’
আর আহমেদাবাদে ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম)। যেখানে সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন সাধারণ জনতাও। এসময় প্রতিবাদকারীদের হাতে থাকা প্লাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমরা ওয়াকফ সংশোধনী বিল প্রত্যাখ্যান করি। ’ এই মিছিল থেকে অন্তত ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে ওয়াকফ সংশোধনী বিল বাতিল চেয়ে বড় আন্দোলনে নামতে দেখা গেছে কলকাতা নগরীতে। ‘জয়েন্ট ফোরাম ফর ওয়াকফ প্রোটেকশন’-এর ডাকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। বিলটি মুসলমানদের অধিকার হরণ করেছে অভিযোগ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ বিতর্ক পর্বের পর গত বুধবার (২ এপ্রিল) গভীর রাতে ওয়াকফ সংশোধনী বিল নিয়ে ভারতের সংসদে ভোটাভুটি হয়। এতে বিলের পক্ষে ২৮৮ এবং বিপক্ষে ২৩২ জন এমপি ভোট দেন। এখন রাজ্যসভা ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর মিললেই বিলটি আইনে পরিণত হবে।
ওয়াকফ বিলের সংশোধনী আইনে কী রয়েছে?
আইন অনুযায়ী, মুসলিম সম্প্রদায়ের দানকরা ধর্মীয়, শিক্ষা ও সেবামূলক কাজে ব্যবহৃত সম্পত্তিকে ওয়াকফ বলা হয়। এগুলো বিক্রি বা হস্তান্তরযোগ্য নয়। নতুন বিলে ওয়াকফ বোর্ডে অ-মুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ভারতে প্রায় ৯ লাখ একর ওয়াকফ জমি রয়েছে।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ওয়াকফ ঘোষণার আগে তার সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অংশ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত নারী ও অনাথদের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আয় যদি এক লাখ টাকার বেশি হয়, তবে সেটির নিরীক্ষা করাতে হবে এবং রাজ্যের নিরীক্ষকরা এটি তদারকি করবেন। এর পাশাপাশি, কোনো সরকারি জমিকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে দাবি করা হলে, তার তদন্ত করবেন জেলা কালেক্টরের ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা।
ওয়াকফ বিল পাসে ভারতীয় মুসলমানদের আপত্তি কেন?
বলা হচ্ছে, ৭০ বছরের পুরনো ওয়াকফ আইনের নতুন সংশোধনীর ফলে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হয়ে যাবে, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের বিষয়। যদি ওয়াকফ সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং আয় বাড়ানো নতুন এই সংশোধনী আইনের মূল উদ্দেশ্য বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। সংসদীয় বিষয়ক এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু দাবি করেছেন, ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে বিরোধী দলগুলো এবং মুসলিম সংগঠনগুলো এই আইনের তীব্র বিরোধিতা করছে।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সম্পত্তির ওপর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল বলে অভিযোগ তাদের। তারা বলছেন, নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে এবং অমুসলিমদের বোর্ডের সদস্য করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা বোর্ডের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলবে।