ট্রাম্প কি ইরান যুদ্ধে নিজের সব লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছেন?

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) একাধিক লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, তেহরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর শক্তি ভেঙে দেওয়া ও শেষ পর্যন্ত ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।

তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর এখন একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তি হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে- ট্রাম্প আসলে কতটা সফল হয়েছেন?

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন: বড় ধাক্কা, কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস নয়

যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ছিল। বিভিন্ন ধরনের প্রায় ২৫০০ থেকে ৬০০০ ক্ষেপণাস্ত্র তাদের হাতে ছিল। এর কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত, যা সহজেই ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম। কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার মিউনিশন ওয়ারহেডও ছিল, যা প্রতিরোধ করা তুলনামূলক কঠিন।

ইরান দীর্ঘপাল্লার ড্রোন উৎপাদনেও অন্যতম বড় শক্তি। বিশেষ করে ‘শাহেদ’ ড্রোন রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করেছে, একইসঙ্গে ইরান নিজেও বিভিন্ন সংঘাতে এগুলো মোতায়েন করেছে।

যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস পর মার্কিন সূত্রগুলো জানায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে। আরও এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস বা মাটির নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হয়।

মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ১৪ মে কংগ্রেসকে জানান, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও দীর্ঘপাল্লার ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাত চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ১৫০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬০০০ ড্রোন প্রতিহত করেছে।

তবে ইরানের হাতে এখনো কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। ৬ জুন কুয়েত ও বাহরাইনে ও ৭ জুন ইসরায়েলের দিকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।

প্রচলিত সামরিক শক্তি: ব্যাপক ক্ষতি, তবুও হরমুজে নিয়ন্ত্রণ

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করেছে। অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ১৬১টি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে ও দেশটির ৮২ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের আগে যেখানে ইরানের বিমানবাহিনী প্রতিদিন প্রায় ১০০টি মিশন পরিচালনা করত, সেখানে বর্তমানে তারা কোনো উড়ানই পরিচালনা করছে না।

তবে এই ক্ষতির পরও ইরান পুরো সংঘাতকালজুড়ে হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) কার্যত বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন এই প্রণালির মাধ্যমে হয়।

ইরান দ্রুতগতির নৌকা, মাইন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রবাহী নৌযান ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছিল। ফলে প্রচলিত সামরিক শক্তিতে বড় ক্ষতি হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তারা এখনও উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি: ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ

ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা। অন্যদিকে, ইরান সবসময় দাবি করে এসেছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা কোনো পারমাণবিক বোমা বানাতে চায় না।

তবে যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি।

গত মাসে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, ইরান চাইলে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পরও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একই সময়সীমার কথা বলেছিল।

অর্থাৎ যুদ্ধের আগে ও পরে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য সময়সীমায় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।

শুক্রবার (১৯ জুন) শান্তি চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে এই পারমাণবিক কর্মসূচি।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু সূত্রগুলোর মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি (Mojtaba Khamenei) এ ধরনের কোনো পদক্ষেপে রাজি নন।

ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক: দুর্বল হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি

২ মার্চ ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে আর ইরাক, লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনের সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করতে দেওয়া যাবে না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও ইরান এসব গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

তবে মার্কিন সামরিক মূল্যায়ন এবং স্বাধীন বিশ্লেষণ বলছে, ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক আগের তুলনায় অনেক কম কার্যকর হয়ে পড়েছে।

এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুদ্ধের আগের ঘটনাগুলো। ইসরায়েল গাজায় হামাসের বহু শীর্ষ নেতা ও হাজার হাজার যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। একইভাবে লেবাননে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের বড় অংশও নিহত হয়েছে।

এছাড়া ২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের ফলে হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটও ইরান হারিয়েছে।

আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটও এসব গোষ্ঠীকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ইরানকে দুর্বল করেছে।

যুদ্ধ চলাকালে হামাস কার্যত গাজা থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো বড় আক্রমণ চালায়নি। ইয়েমেনের হুথিরাও লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারেনি।

তবে হিজবুল্লাহ ২ মার্চ যুদ্ধের অংশ হয়। তারা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। এর জবাবে ইসরায়েল বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালায়।

এই সংঘাতে লেবাননে প্রায় ৩৭০০ মানুষ নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে, ২৮ জন ইসরায়েলি সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে।

শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন: সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা?

যুদ্ধের আগে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু ইরানের জনগণের জন্য ক্ষমতা দখলের ‘সবচেয়ে বড় সুযোগ’।

৬ মার্চ ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ও একটি ‘গ্রহণযোগ্য নতুন নেতৃত্ব’ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হবে না। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারেনি।

তবুও ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি তার লক্ষ্য অর্জন করেছেন। কারণ আয়াতুল্লাহ খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি।

২৯ মার্চ ট্রাম্প নতুন নেতৃত্বকে ‘আরও যুক্তিসঙ্গত ও নতুন শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি আর ইরানের শাসকদের উৎখাতের আহ্বান জানাচ্ছেন না।

সবশেষে যুদ্ধের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-

  • ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
  • প্রচলিত সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।
  • প্রক্সি নেটওয়ার্ক আগের তুলনায় কম কার্যকর।
  • কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনো অক্ষত রয়েছে এবং সেটিই ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য ছিল।
  • হরমুজ প্রণালিতে ইরান এখনও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
  • শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

ফলে ট্রাম্প আংশিক সাফল্য পেলেও তার ঘোষিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যগুলো, বিশেষ করে- পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে থামানো ও ইরানের ক্ষমতা কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনা- অপূর্ণ-ই রয়ে গেছে।

  • Related Posts

    ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’র ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনপ্রিয় স্লোগান ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’- এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের মূল লক্ষ্যে হলো- একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু,…

    Continue reading
    গত ১২ বছর তাদের কোথাও দেখিনি: জামায়াতকে প্রধানমন্ত্রী

    ‘গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ ও জনগণের ক্ষতি করলে সরকারকে বেশি দিন সময় দেওয়া হবে না’—বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যারা বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন আন্দোলন…

    Continue reading

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’র ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

    ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’র ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

    ট্রাম্প কি ইরান যুদ্ধে নিজের সব লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছেন?

    ট্রাম্প কি ইরান যুদ্ধে নিজের সব লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছেন?

    গত ১২ বছর তাদের কোথাও দেখিনি: জামায়াতকে প্রধানমন্ত্রী

    গত ১২ বছর তাদের কোথাও দেখিনি: জামায়াতকে প্রধানমন্ত্রী

    মেসির পারফরম্যান্সে আমি বাকরুদ্ধ: স্কালোনি

    মেসির পারফরম্যান্সে আমি বাকরুদ্ধ: স্কালোনি

    ব্যাটিং ব্যর্থতায় প্রথম টি-টোয়েন্টিতে হার বাংলাদেশের

    ব্যাটিং ব্যর্থতায় প্রথম টি-টোয়েন্টিতে হার বাংলাদেশের

    মাঠে বসে দেখলেন মেসির হ্যাটট্রিক, নাঈম-নাদিয়ার উদযাপন ভাইরাল

    মাঠে বসে দেখলেন মেসির হ্যাটট্রিক, নাঈম-নাদিয়ার উদযাপন ভাইরাল

    ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসীর ঢল

    ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসীর ঢল

    হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেন মেসি

    হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেন মেসি

    আমাদের প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

    আমাদের প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

    আজ মৌলভীবাজার সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

    আজ মৌলভীবাজার সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী