ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‘তাড়াহুড়া’ না করার নির্দেশ ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মধ্যস্থতাকারীদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়া না করা হয়। এর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। খবর বিবিসির।

যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তাতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আলোচনা গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। তবে দুই পক্ষকেই সময় নিতে হবে এবং সঠিকভাবে বিষয়টি সম্পন্ন করতে হবে।

শনিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তির ‘বেশিরভাগ অংশ’ নিয়ে এরই মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেছে। এরপরই জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে যে, এ নিয়ে দ্রুত কোনো ঘোষণা আসতে পারে।

চলতি সপ্তাহে ইরানের কর্মকর্তারাও আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, দুই পক্ষ চুক্তির খুব কাছেও আছে, আবার অনেক দূরেও আছে।

অর্থাৎ কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা এগোলেও এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা এই সমঝোতা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। বরং বেশ কিছু জটিল বিষয়কে পরবর্তীতে আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিধি ও সময়, জব্দ করা ইরানি অর্থ ছাড় করা হবে কি না এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের সীমাবদ্ধতা চায়।

এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেন, এতে ইরানের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখানো হচ্ছে।

সিনেটর টেড ক্রুজ এই সম্ভাব্য চুক্তিকে ভয়াবহ ভুল বলে মন্তব্য করেছেন। আর সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি হলে অপারেশন এপিক ফিউরির সব অর্জনই অর্থহীন হয়ে যাবে।

তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির রিপ্রেজেন্টেটিভ মাইক ললার বলেছেন, মার্কিন প্রশাসন ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে পেরেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়। এরপর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়।

এ সময় ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। অথচ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

এর ফলশ্রুতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, কোনো চুক্তি চূড়ান্ত, অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ পুরোপুরি বহাল থাকবে।

রোববার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প আবারও বলেন, ইরানকে বুঝতে হবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। যদিও তেহরান বারবার দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

কিছু মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান শেষ পর্যন্ত তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে। একে আরও প্রক্রিয়াজাত করে অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশ মাত্রায় নেওয়া তুলনামূলক সহজ বলে মনে করা হয়। সেই পর্যায়ে পৌঁছালে ইরানের পক্ষে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, আমরা বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে প্রস্তুত যে আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছি না।

এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে, যদিও তা এখনো চূড়ান্ত নয়।

তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, গত ৪৮ ঘণ্টার অগ্রগতি হরমুজ প্রণালিকে আবার পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিতে পারে, যেখানে কোনো ধরনের টোল বা বাধা থাকবে না।

শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ইরান একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই সমঝোতা হলে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আরও আলোচনা করা সম্ভব হবে।

ট্রাম্প শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এই সমঝোতাকে সমঝোতা স্মারক বলেই উল্লেখ করেছেন।
আলোচনায় মধ্যস্থতা করা পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, সাম্প্রতিক আলোচনা দেখে মনে হচ্ছে ইতিবাচক কোনো সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং দুই পক্ষ একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

  • Related Posts

    নেতৃত্ব কেবল নীতিতে নয়, কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

    নেতৃত্ব কেবল নীতিতে নয়, বরং বাস্তব কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, লুই আই কানের নকশায় নির্মিত এই জাতীয় সংসদ ভবন অবশ্যই আমাদের গণতন্ত্রের…

    Continue reading
    চীনের কয়লা খনি বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শোক 

    চীনের শানঝি প্রদেশে কয়লা খনি বিস্ফোরণে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (২৪ মে) এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী তার সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গ…

    Continue reading

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    নেতৃত্ব কেবল নীতিতে নয়, কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

    নেতৃত্ব কেবল নীতিতে নয়, কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

    চীনের কয়লা খনি বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শোক 

    চীনের কয়লা খনি বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শোক 

    রাজধানীর কালশী বস্তিতে আগুন

    রাজধানীর কালশী বস্তিতে আগুন

    ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‘তাড়াহুড়া’ না করার নির্দেশ ট্রাম্পের

    ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‘তাড়াহুড়া’ না করার নির্দেশ ট্রাম্পের

    যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা মানছে না ইসরায়েল, লেবাননে নারী-শিশুসহ নিহত ১৫

    যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা মানছে না ইসরায়েল, লেবাননে নারী-শিশুসহ নিহত ১৫

    টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় মিলেছে

    টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় মিলেছে

    ছেলের আইপিএল অভিষেকে শচিনের আবেগঘন বার্তা

    ছেলের আইপিএল অভিষেকে শচিনের আবেগঘন বার্তা

    চোট নিয়ে মাঠ ছাড়লেন মেসি, খেলা হবে তো বিশ্বকাপ?

    চোট নিয়ে মাঠ ছাড়লেন মেসি, খেলা হবে তো বিশ্বকাপ?

    প্রেক্ষাগৃহে উপচেপড়া ভিড়, দাপট দেখাচ্ছে ‘দৃশ্যম ৩’

    প্রেক্ষাগৃহে উপচেপড়া ভিড়, দাপট দেখাচ্ছে ‘দৃশ্যম ৩’

    ধর্মেন্দ্রর সম্মাননা নিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে হেমা মালিনী

    ধর্মেন্দ্রর সম্মাননা নিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে হেমা মালিনী