মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি এআই-তৈরি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ভিডিওতে দেখা যায়, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র খার্গ দ্বীপে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হচ্ছে।
দুই দেশের মধ্যে জুলাইয়ের পর প্রথমবার পাল্টাপাল্টি হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ভিডিওটি পোস্ট করেন। তবে তিনি খার্গ দ্বীপে হামলার হুমকি দিয়েছেন, নাকি সেখানে সত্যিই হামলা চলছে, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পরও খার্গ দ্বীপে হামলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
ইরানের গণমাধ্যমেও এ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
রবিবার ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘খার্গ দ্বীপ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে!!!’ তবে এর সঙ্গে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। রয়টার্স জানিয়েছে, ভিডিওটির বিস্ফোরণের দৃশ্য সম্ভবত এআই দিয়ে তৈরি। ভিডিওটি পরীক্ষা করে এর কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
ইরানের জন্য খার্গ দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে হতো। সেখানে হামলা হলে দেশটির তেল রপ্তানি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না। তবে দেশটির ওপর কোনো হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, কোনো আগ্রাসনের মুখে ইরান চুপ থাকবে না। আগ্রাসনকারীদের কঠোর জবাব দেওয়া হবে। কিরগিজস্তান সফরে যাওয়ার আগে সোমবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তবে খার্গ দ্বীপ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের আগে নাকি পরে পেজেশকিয়ান এ কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান জর্দানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। লারাক দ্বীপটি খার্গ থেকে প্রায় ৬৬০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এদিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সোমবার ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে হামলার জন্য ব্যবহৃত ও হামলাকে সহায়তা করা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করেই জর্দানে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনী আরো জানিয়েছে, লারাকে হামলার জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়। সেখানে মার্কিন সেনা ও হেলিকপ্টার মোতায়েন ছিল বলে দাবি করেছে তারা।
ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহর জানিয়েছে, সোমবার দেশটির এলিট বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। বাহিনীটির বিবৃতি অনুযায়ী, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়। পরে ড্রোনটি উপসাগরের পানিতে পড়ে যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, আইআরজিসির আরেকটি বিবৃতি অনুযায়ী, দক্ষিণ হরমুজ প্রণালিতে দুটি নৌ-মাইনে আঘাত পেয়ে একটি বড় তেলবাহী জাহাজে আগুন ধরে যায়। পরে জাহাজটি পুরোপুরি থেমে যায়।
এদিকে সামরিক পদক্ষেপের বদলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর আবারও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত শুরু হলো। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইরান ও দেশটির ব্যাবসায়িক অংশীদারদের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা জোরদার করেছিল।
ইরানের ওপর আরো নিষেধাজ্ঞার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতি সপ্তাহে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এসব নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য হবে ব্যাংক। রবিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা ব্যাংক দিয়ে শুরু করছি। ইরানের অর্থ রাখা এবং দেশটির সরকারকে সহায়তা করা ঠিক নয়, আমরা ব্যাংকগুলোকে সেটিই জানাচ্ছি।’
ইরানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের অভিযোগে শুক্রবার মিসরভিত্তিক একটি ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাখাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। বেসেন্ট জানান, এর পরের পদক্ষেপ হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহেই আপনারা এ ধরনের আরো অনেক পদক্ষেপ দেখতে পাবেন।’
এদিকে জুলাইয়ের শেষের পর ইরানে প্রথমবারের মতো মার্কিন সামরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তার দাবি, মার্কিন বাহিনী লারাক দ্বীপে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। কৌশলগত বন্দর আব্বাসের কাছে অবস্থিত লারাক দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছে।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নৌ-মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ‘আসন্ন হুমকি’ তৈরি করা ইরানের বিপ্লবী গার্ডের মাইন স্থাপনকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা ‘সীমিত ও নির্দিষ্ট’ অভিযান চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, জর্দানের সেনাবাহিনী তাদের আকাশসীমায় ঢোকা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকও দাবি করেছেন, প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় সপ্তাহান্তে সেখানে দৃশ্যমান পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে দিনে প্রায় পাঁচটিতে নেমে আসে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ, হামলার আশঙ্কায় কিছু জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, মাইনের আঘাতে আগুন ধরা তেলবাহী জাহাজটি নিয়ম ভেঙে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে জাহাজটি বা এর নাবিকদের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। নিয়ম না মেনে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করা অন্য জাহাজগুলোকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে বাহিনীটি।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা সব মাইন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে মাইন স্থাপনকারী যেকোনো জাহাজ ধ্বংস করা হবে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনী এই দাবি ‘স্পষ্ট মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে, ইরানের অনুমতি ছাড়া জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি বন্ধ রয়েছে।
ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হতো। ইরান ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ।









