রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিজের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, রুশ বাহিনী প্রতিদিনই যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হলে এবং কিয়েভ আপস করতে রাজি হলে যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে।
রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে আলাপকালে পুতিন এসব কথা বলেন।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পুতিনের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। চিঠিতে তিনি যুদ্ধের অবসান ঘটাতে দুই নেতার সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, সমাধান না হলে ইউক্রেন লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, পুতিন চিঠির বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন, তবে এখনও তিনি এর বিস্তারিত বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করার সুযোগ পাননি। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, দুই নেতার বৈঠক হলে তা অত্যন্ত ইতিবাচক হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্থলযুদ্ধে এখন পঞ্চম বছর চলছে। যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া দ্রুত বিজয়ের আশা করলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে।
পুতিন দাবি করেন, জনবল, শিল্প সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার দিক থেকে রাশিয়া এগিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি রুশ বাহিনী প্রায় ২ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সরিয়ে দিয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় রাশিয়াকে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
যদিও পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছে, রাশিয়ার অগ্রযাত্রার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং মস্কো এখনও তাদের ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন থেকে অনেক দূরে রয়েছে।
তবে পুতিন আত্মবিশ্বাসী সুরে বলেন, রুশ অভিযান প্রতিদিনই এগিয়ে চলছে।
তিনি দাবি করেন, রাশিয়া বর্তমানে লুহানস্ক অঞ্চলের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া দোনেৎস্ক অঞ্চলের ৮৫ শতাংশের বেশি এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিয়েভ ও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ এটিকে অবৈধ দখল হিসেবে বিবেচনা করে।
পুতিন বলেন, স্বাভাবিকভাবেই ইউক্রেন চায় আমরা আমাদের অগ্রযাত্রা থামাই। কিন্তু যুদ্ধ থামানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো এবং অ্যাঙ্কোরেজে আলোচিত আপসের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা।
তিনি জানান, গত বছর আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তিনি কূটনৈতিক উপায়ে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং কিছু সমঝোতা মেনে নিতে প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন।
পুতিন বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইউক্রেনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত। অ্যাঙ্কোরেজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যে সমঝোতার বিষয়গুলো আলোচনা হয়েছিল, রাশিয়া সেগুলো মেনে নিতে রাজি। এখন ইউক্রেনকেও সেই আপসগুলো গ্রহণ করতে হবে। তাহলে সংঘাত দ্রুত স্বাভাবিক পরিণতির দিকে যাবে।
তবে একই সঙ্গে পুতিন রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাশিয়া এখনও বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ‘ওরেশনিক’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেনি। কেবল পরীক্ষামূলকভাবে এটি নিক্ষেপ করে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। পুতিনের দাবি, এটি প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব, যদিও পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা সেই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আলাপকালে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও মন্তব্য করেন পুতিন। ১৯৯৯ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকা পুতিন বলেন, ২০৩০ সালের পর আবারও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ তার রয়েছে এবং নির্বাচিত হলে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
তবে তিনি বলেন, এখনই সে বিষয়ে ভাবার সময় নয়।
পুতিনের ভাষায়, দেশের সামনে অনেক বড় ও জরুরি সমস্যা রয়েছে। সেগুলোর সমাধান করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।









