সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শ্রমিক ভিসা বন্ধ। তবে গত ৫-৬ বছরে ভিজিট ভিসায় এসে কর্মসংস্থান বা ওয়ার্ক পারমিট করার সুযোগ থাকায় প্রায় এক থেকে দেড় লাখ বাংলাদেশি আরব আমিরাতে আসেন। কিন্তু বর্তমানে ভিজিট ভিসাও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক দেশটিতে আসতে পারছেন না।
তবে হাই প্রফেশনাল ভিসা চালু থাকায় অনেকেই জালিয়াতি করে ভুয়া (ফেক) সার্টিফিকেট বানিয়ে আমিরাতে ঢুকছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি এখন আমিরাত সরকারের দৃষ্টিগোচরে এসেছে। ফলে যে কোনো মুহূর্তে হাই প্রফেশনাল ভিসাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আরব আমিরাতে ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। অথচ সেখানে এখন মাত্র ৮-১০ লাখ শ্রমিক কর্মরত। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি শ্রমিকের একটা সুনাম রয়েছে; বাংলাদেশিরা যেভাবে পরিশ্রম করতে পারেন, অন্যান্য দেশের কর্মীরা সেভাবে পারেন না। আরব আমিরাতে যতগুলো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার সবকটিই বাংলাদেশি শ্রমিক দ্বারা পরিচালিত হয়।
এখানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাংলাদেশি শ্রমিক। এক সময় আরব আমিরাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কদর কম থাকলেও বর্তমানে তাদের চাহিদা আকাশচুম্বী। এখন সবাই বাংলাদেশি শ্রমিক খুঁজলেও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে যেসব ব্যবসায়ী বর্তমানে বাংলাদেশি শ্রমিক রেখেছেন, তারা আবার শ্রমিকদের দ্বারা প্রতিনিয়ত ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমন কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের শ্রমিক সংকটে ভোগার চিত্র।
মোবাইল ব্যবসায়ী আফসার হোসাইন জানান, আমিরাতে তার দুটি মোবাইল শপ আছে। পুরো আমিরাতজুড়েই তার গ্রাহক থাকলেও কর্মী সংকটের কারণে তিনি নতুন কোনো শাখা (ব্রাঞ্চ) খুলতে পারছেন না।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট ঠিকাদার ওবাইদুল হক চৌধুরী সিআইপি জানান, তার পাঁচটি লাইসেন্সে প্রায় দেড় শতাধিক লোক থাকলেও এখন কমতে কমতে তা ৭০-এর কোঠায় চলে এসেছে। শ্রমিক কমে যাওয়ায় বড় কোনো প্রজেক্টের কাজ নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী নুরুল আলম জানান, তার রেস্টুরেন্টে ১২ জন কর্মচারীর মধ্যে ১০ জনই ‘ঘরের ভিসার’ লোক হওয়ায় কয়েকবার জরিমানা (ফাইন) গুনতে হয়েছে তাকে। শুধু রেস্টুরেন্টের ভিসা না হওয়ার কারণে অনেক খাবারের হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বিল্ডিং নির্মাণাধীন ঠিকাদাররা জানান, আগে কাজ করলে ক্লায়েন্ট থেকে বিল পেতে ৩-৪ মাস সময় লাগত। অনেক ক্লায়েন্ট পুরো টাকা মেরে দিত, এমন ঘটনাও অহরহ ঘটেছে। যার ফলে তারা শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারতেন না এবং শ্রমিকদের ৩-৪ মাসের বেতন বকেয়া পড়ে যেত। অনেক ঠিকাদার দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে শ্রমিকদের ৪-৫ মাসের বেতন পুরোটাই খোয়া যেত।
তবে বর্তমানে বাংলাদেশি শ্রমিক সংকটের কারণে ক্লায়েন্টরা ঠিকাদারদের যথাসময়ে বিল পরিশোধ করছে এবং ঠিকাদাররাও শ্রমিকদের বেতন যথাসময়ে দিয়ে দিতে পারছেন। কিন্তু এভাবে ভিসা বন্ধ থাকলে অধিকাংশ ব্যবসায়ীকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
এই কর্মী সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা যেমন মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি বাংলাদেশ হারাচ্ছে বিশাল অঙ্কের রেমিট্যান্স এবং দেশের বেকারত্ব সমস্যারও কোনো অবসান হচ্ছে না।
একদিকে আমরা দেশে মানুষের চাকরি দিতে পারছি না, যার ফলে বেকারত্বের দায়ে মানুষ নানান অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ছে; অন্যদিকে আরব আমিরাতে বাংলাদেশি শ্রমিকের বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মানুষ আসতে পারছে না।
ভিসা বন্ধের এই পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় বাংলাদেশি টাইপিং সেন্টার ও দালালদের দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। এদের অনেকের একাধিক লাইসেন্স ও লোকবল থাকলেও বাস্তবে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। নামেমাত্র ‘ফ্রি ভিসা’র কথা বলে এসব লাইসেন্সে যারা ভিসা লাগিয়েছে, সেসব শ্রমিকরাও এখন পড়েছেন চরম বিপাকে।
আমিরাতে এখন এক কোম্পানির লাইসেন্সধারী ব্যক্তির অন্যত্র কাজ করার অনুমতি না থাকায় চরম ঝুঁকিতে আছেন সেসব কর্মীরা। এমনকি ধরা পড়লে দেশটিতে অবৈধভাবে কাজ করার দায়ে বাংলাদেশে ডিপোর্ট (বহিষ্কার) হওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আবুধাবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে, দূতাবাসের প্রেস সচিব রাষ্ট্রদূতের কাছে ইমেইল পাঠাতে বলেন। তবে মেইল পাঠানো হলেও রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর মেলেনি।









