বাংলাদেশ ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে, খবর রয়টার্স এর

সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে চলতি মাসে স্বাক্ষরিত একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’-তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন এক মন্ত্রী। এই পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে অবস্থান করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ-ইনের (মানুষ ঠেলে দেওয়া) চেষ্টার অভিযোগের জেরে ঢাকা ও নতুন দিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে।

এই পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা সমঝোতা বা চুক্তি হয়, তবে আমাদের তাতে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তারা বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সেখানে গিয়ে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।’

বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, সৌদি আরব ঢাকাকে এই জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তবে এই আমন্ত্রণ ঠিক কবে জানানো হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রটি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ন্যাটোর যৌথ-প্রতিরক্ষা নীতির আদলে এই তিন সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে এই ঐতিহাসিক চুক্তি সই করে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে তৈরি হওয়া তীব্র আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে তারা অঙ্গীকার করেছে যে—যেকোনো এক সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তুরস্কের মতোই বাংলাদেশও একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র, যদিও এদেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যা সুন্নি মুসলিম।

প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ঢাকায় অবস্থিত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনীর দেশ তুরস্ক জানিয়েছে—পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান এবং শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের এই জোটের পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী পররাষ্ট্রনীতির বড় পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক শিবিরগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশ এত দিন বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকাংশে তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এসব পোশাকের বড় অংশ যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। অন্যদিকে, মূলত মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া বলেন, কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক ব্লকের সদস্যপদ কেবল ভারতের সঙ্গেই নয়; বরং চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। তিনি বলেন, ‘এই সম্পর্কগুলো হয়তো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে না, তবে বাংলাদেশ একবার সামরিক জোটে যোগ দিলে—বাংলাদেশ আসলে কোন পক্ষে রয়েছে, সেই প্রশ্ন এড়ানো তখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।’

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা

উভয় পক্ষের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, তারেক রহমানের ছয় মাসের পুরোনো সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে।

চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসংক্রান্ত অনুরোধের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা চলতি মাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছিল ঢাকা। শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যেরও সমালোচনা করেছিল বাংলাদেশ।

মক্কা চুক্তির বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এমন একটি নিরাপত্তা জোটে যোগ দেওয়াকে স্বাগত জানাবে না ভারত, যে জোটে দেশটির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান রয়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এর বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিণতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, কোনো জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতার ধারণা দেশটির রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ খুশি হবে না। তবে সেটিই বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তি হওয়া উচিত নয়।’

  • Related Posts

    স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

    রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি…

    Continue reading
    নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর গুম: প্রধানমন্ত্রী

    গুমকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, এটি মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন এবং একটি বৈশ্বিক সমস্যা। রোববার (৩০ আগস্ট) পালিত হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ…

    Continue reading

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

    স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

    নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর গুম: প্রধানমন্ত্রী

    নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর গুম: প্রধানমন্ত্রী

    বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

    বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

    ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ‘ইতিহাসের সর্ববৃহৎ’ তেল চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পে

    ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ‘ইতিহাসের সর্ববৃহৎ’ তেল চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পে

    যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে লড়বে ইরান:পেজেশকিয়ান

    যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে লড়বে ইরান:পেজেশকিয়ান

    জিম্বাবুয়েতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত

    জিম্বাবুয়েতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত

    নেপাল-চীনে বন্যায় নিহত প্রায় ৭০০, নিখোঁজ ৩০০০

    নেপাল-চীনে বন্যায় নিহত প্রায় ৭০০, নিখোঁজ ৩০০০

    ডুবে গেছে কাপ্তাই হ্রদের ঝুলন্ত সেতু, প্লাবিত নিম্নাঞ্চল

    ডুবে গেছে কাপ্তাই হ্রদের ঝুলন্ত সেতু, প্লাবিত নিম্নাঞ্চল

    শচীন-পন্টিংকে ছাড়িয়ে জো রুটের বিশ্বরেকর্ড

    শচীন-পন্টিংকে ছাড়িয়ে জো রুটের বিশ্বরেকর্ড

    চার গোল করলেন মেসি, ৭-১ গোলে জিতে ইতিহাস গড়ল ইন্টার মিয়ামি

    চার গোল করলেন মেসি, ৭-১ গোলে জিতে ইতিহাস গড়ল ইন্টার মিয়ামি