সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কথিত পরিকল্পনা নিয়ে তুরস্ককে ‘স্পষ্ট বার্তা’ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, তুরস্কের কোনো সামরিক উপস্থিতি সিরিয়ার দক্ষিণ দিকে এগিয়ে এলে ইসরায়েল তা মেনে নেবে না।
বুধবার স্থানীয় সময় এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, তুরস্কের কোনো সামরিক ঘাঁটি দক্ষিণ দিকে এগিয়ে এলে সেটি ইসরায়েলের জন্য হুমকি হবে। বিষয়টি তুরস্ককে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল জানতে পেরেছে, তুরস্ক আলেপ্পোর কাছে তাদের বর্তমান অবস্থানের দক্ষিণে একটি বিমানবন্দরে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। এ তথ্য পাওয়ার পরই ইসরায়েল তুরস্ককে সতর্ক করে।
তিনি বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, তুরস্ক আলেপ্পোর কাছে তাদের সীমারেখার দক্ষিণে একটি বিমানবন্দরে অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তাই আমরা একটি বার্তা পাঠিয়েছি। তুরস্ক ওই বার্তা পেয়েছিল কি না জানতে চাইলে নেতানিয়াহু বলেন, বার্তাটি তুরস্কের কাছে পৌঁছেছিল। তবে তার দাবি, তুরস্ক সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে পারেনি।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ অধিদপ্তর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তাদের দাবি, এসব অভিযোগের আসল উদ্দেশ্য হলো সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিমান হামলাকে বৈধতা দেওয়া। তুরস্ক আরো জানিয়েছে, সিরিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তারা সিরীয় সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তুরস্ক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অঞ্চলে ‘সম্প্রসারণবাদী ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী নীতি’ অনুসরণের অভিযোগ করেছে।
ইসরায়েলের এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যও। সিরিয়ায় যুক্তরাজ্যের ভারপ্রাপ্ত বিশেষ প্রতিনিধি ব্যারি পিচ বলেছেন, আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তার মতে, এ ধরনের হামলা সিরিয়ায় আরো অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তিনি ইসরায়েলকে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর এবং আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। পিচ বলেন, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে ইসরায়েল, সিরিয়া এবং পুরো অঞ্চলের জন্য আরো শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব। হামলার পর সিরিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে জর্ডানও। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফোনালাপে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সিরিয়ার প্রতি জর্ডানের সংহতি ও সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। দুই দেশের পক্ষ থেকে অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে চলমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হামলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘও। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক এই হামলাকে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আকাশসীমার ‘আরেকটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রেসিডেন্ট দূত টম ব্যারাকও ইসরায়েলের হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি হামলাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ব্যারাকের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এগিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ তৈরি করে না।
আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে মোট চার দফা বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাবেক সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর ওই সামরিক স্থাপনায় এটিই ইসরায়েলের প্রথম হামলা বলে জানা গেছে। সিরিয়ায় তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যেই এই হামলা হলো। একদিকে তুরস্ক সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, সিরিয়ার দক্ষিণ দিকে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। ফলে সিরিয়ার ভূখণ্ডে তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।









