ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে সামার কিকঅফ কাপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় হুসুম বোল্ডক্লাব মাঠে খেলার আয়োজন করে কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ইউনাইটেড। ম্যাচটির পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল বাংলাদেশ স্পোর্টস ফেডারেশন ইন ডেনমার্ক (বিএএসএফইডি)।
একের পর এক আক্রমণ, গোলমুখে ধারাবাহিক শট, শেষদিকে পেনাল্টি- তবুও কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পেলো না কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ঈগল। বিপরীতে একটি গোলকে পুঁজি করে এবং গোলরক্ষক নাজমুল আহমেদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ১–০ গোলের জয় তুলে নিয়েছে কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড লায়ন।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ঈগল। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে চাপ তৈরি করে একাধিকবার গোলের সুযোগও তৈরি করে তারা। কিন্তু লায়নের গোলরক্ষক নাজমুল আহমেদ যেন গোলবারের নিচে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। ঈগলের একের পর এক শট ও আক্রমণ দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করেন তিনি।
ফিফার আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম অনুসরণ করে অনুষ্ঠিত ম্যাচে খেলোয়াড়দের সুবিধার জন্য দুই দফা পানি পানের বিরতি রাখা হয়। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিট শেষে হয় বিরতি। বিরতির পরও আক্রমণের ধার অব্যাহত রাখে ঈগল। তবে লায়নের রক্ষণ ও গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় গোলের দেখা পাচ্ছিল না তারা।
অবশেষে ম্যাচের ৬৫তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড লায়নের হয়ে গোল করেন এমডি রাইহান। তার গোলে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় লায়ন।
গোল হজমের পর সমতা ফেরাতে আরও মরিয়া হয়ে ওঠে ঈগল। ম্যাচের শেষদিকে তাদের আক্রমণের ধার আরও বেড়ে যায়। প্রায় ৮৫তম মিনিটে পেনাল্টি পায় কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ঈগল। ম্যাচে সমতা ফেরানোর সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই পেনাল্টি কাজে লাগাতে পারেনি তারা।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ১–০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড লায়ন।
গোলবারের নিচে নাজমুল যেন দুর্ভেদ্য দেয়াল ম্যাচের ফলাফলে সবচেয়ে বড় প্রভাব রাখেন লায়নের গোলরক্ষক নাজমুল আহমেদ। ঈগলের একাধিক গোলের সম্ভাবনা রুখে দিয়ে পুরো ম্যাচে অসাধারণ গোলরক্ষণের নজির দেখান তিনি। ম্যাচের এমন গুরুত্বপূর্ণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন নাজমুল আহমেদ।

ম্যাচটির ফলাফলের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও শক্তিশালী করাই ছিল এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ইউনাইটেডের অন্যতম অ্যাডমিন এমডি জাহিদ হোসাইন বলেন, “আমরা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি ও শক্তিশালী করার জন্য ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করি। ডেনমার্কে আমরা সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু বাংলাদেশি ভাই ও বন্ধুরা যখন একসঙ্গে খেলতে মাঠে আসেন, তখন এখানে বাংলাদেশের একটা আবহ তৈরি হয়। আমরা আমাদের দেশকে মিস করি। তাই সারা বছর এ ধরনের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেন আমাদের ভ্রাতৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়।”
বাংলাদেশ স্পোর্টস ফেডারেশন ইন ডেনমার্কের সভাপতি আবু বকর আবরার বলেন, “এই খেলায় অংশীদার হতে পেরে বিএএসএফইডি আনন্দিত। আমরা ডেনমার্কজুড়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে খেলাধুলার প্রসার ঘটাতে চাই। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাকে আমাদের কমিউনিটির মধ্যে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছি। এর মাধ্যমে সবাইকে একটি স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ কর্মজীবন বজায় রাখতে উৎসাহিত করা সম্ভব।”

জয়ী দলের অধিনায়ক খালিদ হোসাইন অনিক বলেন, “১–০ গোলে জয় পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। ম্যাচটি ছিল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। আমাদের সমর্থনে মাঠে উপস্থিত হওয়া সব দর্শকের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দেরও ধন্যবাদ জানাই, তারা দারুণ ক্রীড়াসুলভ মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন।”
আয়োজকদের পক্ষ থেকে মির্জা জুলকারনাইন জানান, বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ইউনাইটেড ভবিষ্যতেও সারা বছর ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।

মাঠে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অনেক বাংলাদেশি পরিবার ও শিশু-কিশোর। তাদের উপস্থিতি আয়োজনটিতে যোগ করে বাড়তি প্রাণ। এক দর্শক বলেন, “আমরা চাই আমাদের সন্তানরাও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হোক। আজ যারা বাবা-মায়ের সঙ্গে খেলা দেখতে আসছে, তাদের মধ্য থেকেই হয়তো ভবিষ্যতে কেউ ভালো ফুটবলার হবে এবং বাংলাদেশের জন্য খেলবে। জামাল ভূঁইয়া আমাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা।”

ডেনমার্কে বেড়ে উঠে পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জামাল ভূঁইয়া প্রবাসী নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ। তার মতো ভবিষ্যতে আরও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার বাংলাদেশের ফুটবলে অবদান রাখবে- এমন প্রত্যাশাও রয়েছে।
ম্যাচ শেষে অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার ও মেডেল প্রদান অনুষ্ঠান। বিজয়ী কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড লায়নের হাতে তুলে দেওয়া হয় চ্যাম্পিয়ন ট্রফি, আর কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ঈগল পায় রানার্সআপ ট্রফি। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের মধ্যে মেডেলও বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেহেদী তালহা, ওয়ায়েজ ফারুক, আবির সানি, মোহাম্মদ ফারুক, শামীম ইমন, বাতেন আহমেদসহ কমিউনিটির অন্যান্য সদস্য ও সমর্থকরা।
খেলা শেষে ছিল সন্ধ্যার খাবারের আয়োজন। খেলোয়াড়, আয়োজক, অতিথি ও কমিউনিটির সদস্যরা একসঙ্গে খাবারে অংশ নেন। খেলাধুলার উত্তেজনা শেষে সেখানে তৈরি হয় আড্ডা, হাসি-আনন্দ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পরিবেশ।

কোপেনহেগেন ব্রাদারহুড ইউনাইটেড মূলত ডেনমার্কে বসবাসরত খেলাধুলাপ্রেমী বাংলাদেশিদের একটি হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক কমিউনিটি গ্রুপ। খেলাধুলার পাশাপাশি দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং প্রবাসে বাংলাদেশিদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
কোপেনহেগেনের এই আয়োজন তাই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশিদের একত্রিত হওয়ার, নতুন সম্পর্ক গড়ার এবং নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব আরও দৃঢ় করার এক আনন্দঘন উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।










