ইউরোপের ট্রাকচালকের সংখ্যা যথেষ্ট কম। এই চালক ঘাটতি পূরণ করেন মূলত অভিবাসী শ্রমিকেরা। কিন্তু প্রতিবেদন অনুযায়ী, জটিল সীমান্ত-অতিক্রমকারী লজিস্টিক চেইনের মধ্যে অনেক অভিবাসীচালকই ঋণের বোঝা, নির্ভরশীলতা এবং নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ট্রাকচালনা মূলত অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে চালকের সংখ্যার ঘাটতি বা স্বল্পতা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ইউরোপের বাইরে নিয়োগপ্রক্রিয়া বিস্তৃত করতে বাধ্য করছে।
তবে, ট্রান্স ডট ইনফো (পোল্যান্ড-ভিত্তিক একটি কোম্পানি ইউরোপের পরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং লজিস্টিক শিল্প সংক্রান্ত তথ্য প্রদানকারী)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অভিবাসী শ্রমিকরা শোষণ ও ঋণের ফাঁদে পড়ার উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।
স্পেন, জার্মানি এবং লিথুয়ানিয়ার মতো দেশের পরিবহন কার্যক্রমগুলো ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, তুরস্ক, পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা, এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চল থেকে চালক নিয়োগ করছে।
ট্রান্স ডট ইনফো অনুযায়ী, এখন আন্তর্জাতিক ‘পাইপলাইন’ সিস্টেমের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যেখানে শ্রমিকদের স্থানান্তরের আগে স্ক্রিনিং, প্রশিক্ষণ এবং সার্টিফিকেশন দেওয়া হয়।
সংক্ষিপ্ত মেয়াদের নিয়োগের পরিবর্তে, লজিস্টিক কোম্পানিগুলো বিদেশে চালকদের প্রস্তুত করার জন্য গঠনমূলক নিয়োগ চ্যানেল তৈরি করছে। যেখানে ভাষা প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাজের সময় ও নিয়মাবলীর সঙ্গে সম্মতি নিশ্চিত করা হয়। অভিবাসী চালকদের এখন ইউরোপীয় পণ্য পরিবহনের কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
কয়েকটা কোম্পানি অ-ইইউ কর্মীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সরকারগুলোও সরবরাহ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সীমান্ত-অতিক্রমকারী নিয়োগ চুক্তিগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। তবে, বিশ্বব্যাপী শ্রমিক মডেলের দ্রুত সম্প্রসারণ তাদের অসহায়তার বিষয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে।
লিথুয়ানিয়ায় পরিবহন কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালেই তৃতীয় দেশ থেকে ২৫ হাজারের বেশি চালক নিয়োগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, কিছু অভিবাসী চালক ঋণ-ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা এবং শোষণমূলক পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
ট্রান্স ডট ইনফো জানিয়েছে, শ্রমিকরা সাধারণত মধ্যস্থতাকারীদের হাজার হাজার ইউরো অগ্রিম অর্থ হিসাবে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তারা গন্তব্যে পৌঁছে নিয়োগকর্তাদের ওপর আর্থিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এছাড়াও মজুরি কেটে নেওয়া, দলিল বা নথি আটকে রাখা এবং গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার মতো অভিযোগও উঠেছে অনেক সময়।
তদন্তকারীরা বলেছেন, এগুলো সম্ভবত পৃথক ঘটনা নয়। এগুলো কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। যদিও শিল্প প্রতিনিধিরা দাবি করেন, অধিকাংশ কোম্পানি নিয়ম মেনে চলে এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করে এই খাত টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।
তবে, পরিবহন শিল্পে অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ নতুন কিছু নয়। নেদারল্যান্ডসের একটা ঘটনায় তাজিকিস্তানের এক ব্যক্তিকে শোষণের ঘটনার প্রমাণ মিলেছে। লিথুয়ানিয়ার একটি পরিবহন কোম্পানির অধীনে কাজ করা ওই চালক জটিল উপ-ঠিকাদারি চেইনের মধ্যে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।
ইউরোপীয় পরিবহন নিরাপত্তা কাউন্সিলের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগের পর তিনি মাসের পর মাস ইউরোপের একাধিক দেশে ট্রাক চালিয়েছেন। কিন্তু কোনো বেতন পাননি। বাধ্য হয়ে নিজের ট্রাকে বসবাস করছিলেন ওই ব্যক্তি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ বিশ্রাম এবং সময়মতো বেতনের আইন থাকা সত্ত্বেও এ ঘটনা ঘটেছে। পরে তিনি গাড়িচালানো বন্ধ করে বেতন আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেন এবং শ্রমিক সংগঠনের সমর্থনে মামলা করেন।
এ ঘটনাটি ইউরোপীয় লজিস্টিক্সের ব্যাপক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও প্রকট করে তুলেছে। যেখানে অভিবাসী চালকরা প্রায়শই একটি দেশে নিবন্ধিত কোম্পানির অধীনে নিয়োগপত্র পেলেও কাজ করেন একাধিক দেশে।
ইউরোপীয় পরিবহন নিরাপত্তা কাউন্সিলের মতে, এই নানারকম ছোটখাটো বা উপ ঠিকাদারি এবং ‘পোস্টেড ওয়ার্কার’ ব্যবস্থা শ্রমিকের অধিকার প্রয়োগের বিষয়টাকে কঠিন করে তোলে ফলে অভিবাসী চালকদের মৌলিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনি পদক্ষেপ এবং শ্রমিক সংগঠনের হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে হয়।










