প্রকৃতির আবর্তে ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আজহাতেও টানা ছুটির ফাঁদে পড়েছে দেশ। সাপ্তাহিক ও ঈদ মিলিয়ে টানা ছুটি সরকারি চাকরিজীবীদের পরিবারে ঈদ আনন্দের মাত্রা বাড়িয়েছে। সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে ঈদ হলে ঈদের পরে সাপ্তাহিক বন্ধ যোগ হয়ে লম্বা সময় ঘোরাঘুরি করা যেত। কিন্তু ঈদের বন্ধ সাপ্তাহিক বন্ধের সঙ্গে মিলিয়ে যাওয়া অনেকের মনে বেজায় কষ্টও ভর করেছে। এরপরও ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে সৈকতে পদচারণা বেড়েছে পর্যটক-দর্শনার্থীদের।
দুপরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সৈকতের লাবণী-সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টসহ দর্শনীয় স্থানগুলো লোকারণ্য হয়ে ওঠে। তাজা ফলের ছড়াছড়ির এ মধু মাসে পর্যটক আকর্ষণ বাড়াতে কক্সবাজারে প্রথমবারের মতো তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে সপ্তাহব্যাপী ফ্রেশ ফ্রুটস ফ্যাস্টিভাল আয়োজন চলছে। ফল দিয়ে উপস্থাপিত বাহারি রসনা খুবই সাশ্রয়ী দামে উপভোগ করতে পারছেন পর্যটক ও ভোজনরসিকরা।
২২ মের সাপ্তাহিক ছুটির মধ্য দিয়ে মূলত কোরবানির বন্ধ শুরু হয়। এরপরও কোরবানির পশু ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার্থে শনি-রবি-সোম ব্যাংক খোলা রাখা হয়। অতীতের মতো পর্যটন ব্যবসা চাঙা হওয়ার আশায় পর্যটক বরণ ও সেবায় প্রস্তুতি নেন সংশ্লিষ্টরা। তবে উল্লেখ করার মতো আগাম বুকিং হয়নি বলে জানান ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার মোস্তফা।
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস লিমিটেডের বিপণন বিভাগের কক্সবাজার প্রধান ইমতিয়াজ নূর সোমেল বলেন, তীব্র গরম ও হঠাৎ বৃষ্টি এমন বৈরী আবহাওয়াতেও কোরবানির টানা ছুটিতে ৮০-৯০ শতাংশ বুকিং আশাছিল। কিন্তু আমরা মাত্র তিনদিনের জন্য গড়ে ৪০ শতাংশ রুম আগাম বুকিং পেয়েছি। ঈদে দুই রাতের প্যাকেজের সঙ্গে একটি গালা ডিনার, মিউজিক্যাল প্রোগ্রাম (দলছুট ব্যান্ড-৩০ মে) সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে ২৬ হাজার টাকায় ঘোষণা করা ছিল। এ প্যাকেজে আমরা বেশকিছু বুকিং পেয়েছি। এ গালা ডিনারটি চাইলে ওয়াকিং গেস্টরাও উপভোগ করতে পারেন।’
সরেজমিন দেখা গেছে, ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। বিকেলে পর থেকেই লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে দেখা গেছে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সমুদ্রের ঢেউ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে সৈকতে ভিড় করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরা।
সাগরের গর্জন আর মনোমুগ্ধকর সৈকতের রূপ উপভোগে কেউ সমুদ্রের পানিতে নেমে আনন্দ করছেন, আবার কেউ সৈকতের বালুচরে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক রহমান ফাহিম বলেন, ‘ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে কক্সবাজারের বিকল্প নেই। ঈদের টানা ছুটি হলে শেষের দিকে ছুটি কম। তবুও কক্সবাজার এসে পরিবার নিয়ে সময়টা দারুণ কাটছে।’
সৈকতে কাজ করা সি সেইফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার মুহাম্মদ ওসমান বলেন, ‘গোসলরত পর্যটকদের বিপদাপন্ন হওয়া থেকে রক্ষায় সৈকতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন লাইফগার্ড কর্মীরা। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়ন সূত্র জানায়, অতীতের মতো এবারও ঈদে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তায় ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্ট ছাড়াও ইনানী, হিমছড়ি ও পাটোয়ারটেক এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘ঈদের ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির মাঝে মিলিয়ে গেছে। তাই টানা সরকারি ছুটি হলেও কম দিনই আমরা পর্যটক পাচ্ছি। তবুও কয়েকদিনে কক্সবাজারে লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটতে পারে। শহরের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে কমবেশি বুকিং রয়েছে।’
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাব ও ট্যুরস অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (টুয়াক) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘রোদ-মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরিতে যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রশান্তি খুঁজছেন, তাদের জন্য কক্সবাজার হতে পারে মনের মতো আদর্শ গন্তব্য। নীল জলরাশি আর বালুকাময় সমুদ্রসৈকত ছাড়াও ঘুরে দেখার মতো অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে কক্সবাজারে। যেগুলোর অনেকগুলোই এখনো অনেকের অজানা। এসময়ে যারা ঘুরতে আসবেন, তারা চাইলে সেসব জায়গায় ঘুরে আসতে পারেন।’
শাহপরীর দ্বীপ
দেশের স্থলভাগের শেষ সীমানা টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপ। টেকনাফ শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরত্বের শাহপরীর দ্বীপ থেকে সমুদ্রকে তিন ভাগে উপভোগ করা যায়। রয়েছে দীর্ঘ জেটি, যেখানে দাঁড়িয়ে খুব সহজেই উপভোগ করা যায় সমুদ্র আর চারপাশের অপরূপ দৃশ্য। এই দ্বীপ থেকে দেখা যায় মিয়ানমারের মংডু অঞ্চল, সেখানকার পাহাড় এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপও। এখানে নতুন সংযোজন হয়েছে ৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়ক। এ সড়ক মিঠামাইনকে মনে করিয়ে দেয়। যা দেখতে ভ্রমণপিয়াসীদের ভিড় লেগেই থাকে।

যেভাবে যাওয়া যায়
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে টেকনাফ যাওয়া যায়। আবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসে সেখান থেকে বাস, কার, চাঁদের গাড়ি (ট্যুরিস্ট জিপ) অথবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শাহপরীর দ্বীপে যাওয়া যায়।
এর পাশাপাশি সাবরাং এলাকায় নির্মাণাধীন ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’ দর্শনার্থী টানছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি প্রায় ৩৯ হাজার পর্যটক সেখানে সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। বর্তমানে চলমান কাজ দেখতে পর্যটকদের ভিড় থাকে সাবরাং জিরো পয়েন্টে।
জাহাজপুরা গর্জন ফরেস্ট
কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী গর্জন বৃক্ষ। এই বাগানে রয়েছে পাঁচ হাজার ৭৭২টিরও বেশি মাদার ট্রি। একেকটি গাছের উচ্চতা ৭০ থেকে ৮০ ফুট এবং বেড় ১০ থেকে ১২ ফুট। শতবর্ষী এসব গাছ আর সবুজ অরণ্যে গড়ে ওঠা পরিবেশ দেখে প্রকৃতির শীতল ছোয়া নিতে পারেন।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। বেলাভূমির সৈকতের পাশাপাশি বন-উপবন, খাল-নদী, ঝিরি-ঝরনা, বন্যপ্রাণী, পাখ-পাখালি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই জেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর এসব পর্যটনকেন্দ্র সরকারি পরিচর্যা পেলে পর্যটকদের পদচারণায় পুরো বছর মুখর থাকতে পারে বলে মনে করছেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা।









