কানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নতুন প্রজন্ম নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ নেই। সভা, আড্ডা, অনুষ্ঠান কিংবা পারিবারিক আলোচনায় আমরা প্রায়ই বলি, ছেলেমেয়েরা আমাদের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, বাংলা ভাষার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের ভাবনার মিল নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই তাদের জন্য কিছু করছি? আমরা কি তাদের কথা শুনছি? নাকি শুধু তাদের নিয়ে কথা বলেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছি?

আমাদের কমিউনিটির বড়রা পার্টি, বনভোজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নির্বাচন, সভা-সমাবেশসহ নানা উপলক্ষে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পান। সেখানে বক্তব্য হয়, পরিচয় হয়, সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু এই একই কমিউনিটির তরুণদের জন্য কোথায় সেই জায়গা? কোথায় সেই মঞ্চ, যেখানে তারা নিজেদের কথা বলবে, নিজেদের আনন্দ, উদ্বেগ, স্বপ্ন ও সংকট ভাগ করে নেবে? অনেক সময় দেখা যায়, একই ঘরে থেকেও বাবা-মা আর সন্তান যেন দুই ভিন্ন জগতে বাস করছে। বাবা-মা যে নাটক দেখেন, যে গান শোনেন, যে বিষয় নিয়ে কথা বলেন, তা সন্তানদের টানে না। আবার সন্তানদের আগ্রহ, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার ভেতরে প্রবেশ করার ধৈর্য বা উদ্যোগ অনেক বাবা-মায়ের নেই।

নতুন প্রজন্ম নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা আছে, কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়ানোর বাস্তব আয়োজন কম। আমরা ভাবি, কিন্তু বাস্তবায়ন করি না। আমরা উপদেশ দিই, কিন্তু শুনি না। আমরা চাই তারা আমাদের বুঝুক, কিন্তু আমরা কি তাদের বোঝার চেষ্টা করি? নৃতত্ত্ববিদ মার্গারেট মীড (Margaret Mead) এর একটি কথার সারকথা হলো, শিশু ও তরুণদের কী ভাবতে হবে তা শেখানো নয়, কীভাবে ভাবতে হবে তা শেখানোই বড় দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, “Children must be taught how to think, not what to think.”
এই প্রেক্ষাপটেই গত ২৫ এপ্রিল টরন্টোর ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হলো একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি মাইশা জারিন ও সৃজনি রহমানের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল নগরীর আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রভাব নিয়ে কমিউনিটিতে সচেতনতা তৈরি করা। এটি কেবল তথ্য বিনিময়ের আয়োজন ছিল না; বরং ছিল অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ ভাবনার বিনিময়। অনুষ্ঠানটি নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে নতুন প্রজন্মকে ঘিরে আমাদের ভূমিকা, দায়বদ্ধতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

আলোচনার শুরুতেই উঠে আসে টরন্টোর দ্রুত উন্নয়ন কীভাবে মানুষের যাপিত জীবন বদলে দিচ্ছে। অবিরাম ট্রাফিক জ্যাম, স্কুলে অতিরিক্ত ভিড়, সবুজ জায়গার সংকোচন এবং জনসমাগমস্থলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখন অনেক নাগরিকের দৈনন্দিন বাস্তবতা। বক্তারা জানান, আবাসন সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধির চাপ শুধু নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর নয়, কর্মজীবী মধ্যবিত্ত ও তরুণদের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেকেই নিজেদের পরিচিত এলাকায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে তরুণদের পড়াশোনা, পেশা নির্বাচন, পরিবার গঠন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যাচ্ছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সামাজিক প্রভাব। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধনগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। পুরনো অভিবাসী এবং নতুন আগতদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু ভবন, রাস্তা বা অবকাঠামোর নয়; এটি মানুষের সম্পর্ক, আস্থা এবং কমিউনিটির ভেতরের বন্ধনেও প্রভাব ফেলছে।
সরকারি পরামর্শ প্রক্রিয়া নিয়েও বক্তারা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়াগুলো অনেক সময়ই সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য নয়। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, জটিল উপস্থাপন, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব এবং সীমিত প্রচারের কারণে অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কার্যত সীমিত থেকে যায়।
টরন্টো সিটির নিজস্ব Youth Engagement Strategy তেই উল্লেখ করা হয়েছে, নগর পরিকল্পনার আলোচনায় তরুণদের কণ্ঠ অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে। অথচ ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণরা শহরের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাস্তবতা ক্যাম্পবেল লাইব্রেরির আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
বয়োজ্যেষ্ঠ অতিথিদের অভিজ্ঞতাও ছিল হতাশার। তারা জানান, তাদের এলাকায় বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হলেও এসব সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে বা এতে তাদের মতামতের কী গুরুত্ব ছিল, তা তারা বুঝতে পারেন না। এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তাদের মধ্যে এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করছে।
তরুণ সমাজকর্মী নুহা বলেন, “গণবিজ্ঞপ্তির সাইনবোর্ডগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন মানুষ সেগুলো উপেক্ষা করে চলে যায়।” তার এই মন্তব্য সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতাকে সামনে আনে। তথ্য আছে, কিন্তু তা মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেকে মনে করেন, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বা জনগণের সম্পৃক্ততা অনেক সময় কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের ধারণা, অনেক সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া থাকে; পরে জনগণের মতামত নেওয়া হয় শুধু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য। এ ধরনের অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করে।
রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা জানান, নির্বাচনের সময় যোগাযোগের সুযোগ থাকলেও পরে সেই যোগাযোগ আর বজায় থাকে না। কাউন্সিলরদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেকেই নিজেদের অবহেলিত মনে করেন।
এই পরিস্থিতিতে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, তা হলো সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে অনেক সংগঠন থাকলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। শক্তিশালী কমিউনিটি অ্যাডভোকেসি এবং সম্মিলিত পদক্ষেপই পারে পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে।
দক্ষিণ এশীয় ও বহুসাংস্কৃতিক কমিউনিটির কিছু উদ্যোগ থেকেও এখানে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। যেমন, Council of Agencies Serving South Asians বা CASSA দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির অধিকার, অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের জন্য বিভিন্ন সংগঠনকে একত্রিত করে কাজ করে। Toronto Area Solidarity Summer Alliance বা TASSA দক্ষিণ এশীয় ও Indo Caribbean তরুণদের সংগঠিত হওয়া, নেতৃত্ব শেখা এবং কমিউনিটি ইস্যুতে সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রশিক্ষণ দেয়। আবার SACHAYS তরুণ ও প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, মেন্টরশিপ, পিয়ার সাপোর্ট ও কাউন্সেলিংসহ নানা কর্মসূচি পরিচালনা করে। এসব উদ্যোগ প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ তৈরির বাস্তব মডেল হতে পারে।
এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, যাদের কথা আমরা প্রায়ই শুনি না, তাদের অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশা এখানে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই আলোচনা নিছক একটি অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সূচনা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নতুন প্রজন্মকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করাই যথেষ্ট নয়, তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রক্রিয়ায় অংশীদার করাও জরুরি। কমিউনিটির অস্তিত্ব রক্ষায় প্রবীণদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নবীনদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন প্রজন্মকে বাদ দিয়ে কোনো কমিউনিটির সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে না। -নজরুল ইসলাম মিন্টু টরন্টো থেকে প্রকাশিত দেশেবিদেশে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।










