বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যক্তি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তাকে নিরাপদ রাখাটাই যেন কঠিন হয়ে উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ‘সিক্রেট সার্ভিসের’।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বাইরে গুলির ঘটনা ঘটে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাতে হোয়াইট হাউজ সংবাদদাতাদের বার্ষিক নৈশভোজ চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনায় সন্দেহভাজন বন্দুকধারী ৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এখনো পরিষ্কার নয়। তবে কীভাবে তিনি এতটা কাছে পৌঁছাতে পারলেন- সেই প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে এক হত্যাচেষ্টায় তার কানে গুলি ছুয়ে যায়। মাত্র ৬৪ দিন পর ফ্লোরিডার গলফ কোর্সে খেলতে গিয়ে আবারও তিনি এক বন্দুকধারীর লক্ষ্যবস্তু হন।
এবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীর হিলটন হোটেলে সাংবাদিকদের নৈশভোজ চলাকালে গুলির শব্দে অনুষ্ঠানস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আবারও প্রশ্নের মুখে। প্রশ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ওয়াশিংটনের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে থাকা ওই হোটেলে নিরাপত্তা যাচাই কতটা কঠোর ছিল।
বিবিসির উত্তর আমেরিকা প্রধান সংবাদদাতা গ্যারি ও’ডোনোহু ওই নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, হোটেলের চারপাশে কয়েক ঘণ্টা সড়ক বন্ধ থাকলেও ভেতরের নিরাপত্তায় খুব বেশি কড়াকড়ি ছিল না। তিনি লেখেন, দরজার বাইরে থাকা নিরাপত্তাকর্মী আমার টিকিট খুব দূর থেকে মাত্র একবার দেখে নিয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তি একটি সিক্রেট সার্ভিস চেকপয়েন্টের মধ্য দিয়ে দৌড়ে ঢুকে পড়ছে, যা ছিল বলরুমের একতলার ওপর। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার কাছে একটি শটগান, একটি পিস্তল ও একাধিক ছুরি ছিল। পরে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গুলিবিনিময় করেন ও শেষ পর্যন্ত তাকে থামানো হয়।
সিএনএনের সাংবাদিক উলফ ব্লিৎজার জানান, তিনি সন্দেহভাজনকে একটি ‘খুবই ভারী অস্ত্র’ দিয়ে একাধিকবার গুলি ছুড়তে দেখেছেন।
পরবর্তীসময়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে হাতকড়া পরা এক অর্ধনগ্ন ব্যক্তি মেঝেতে পড়ে আছেন ও চারপাশে সিক্রেট সার্ভিস সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন।
অস্থায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ জানান, ধারণা করা হচ্ছে সন্দেহভাজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করেছিল, ‘সম্ভবত প্রেসিডেন্টকেও’।
পুলিশ বলেছে, কোল টমাস অ্যালেন ওই হোটেলের অতিথি ছিলেন, যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও হোটেলটি স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত কিম ড্যারক, যিনি আগে এ ধরনের নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আপনি যদি সেখানে অতিথি হিসেবে থাকেন ও আপনার খারাপ উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে নিরাপত্তার একটি মাত্র ধাপ পার হলেই আপনি বলরুমে ঢুকে পড়তে পারেন।
ট্রাম্প নিজেও বলেন, হিলটন হোটেল ‘বিশেষভাবে নিরাপদ কোনো ভবন নয়’। তিনি হোয়াইট হাউজে নতুন বলরুম নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন, যা এখনো আইনি জটিলতায় রয়েছে।
তিনি বলেন, এটি বড় একটি ঘর, অনেক বেশি নিরাপদ। এটি ড্রোন-প্রুফ, বুলেটপ্রুফ কাচ থাকবে। আমাদের এই বলরুম দরকার। তিনি সিক্রেট সার্ভিসের ‘সাহসিকতার’ প্রশংসা করেন। বলেন, তারা তাকে ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে দ্রুত মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেয়।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্দুকধারী বলরুমে প্রবেশ করতে না পারায় বোঝা যায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা কার্যকর ছিল।
সাবেক এফবিআই এজেন্ট জেফ ক্রোগার বলেন, এটাই সিক্রেট সার্ভিসের কাজ—যখন গুলির শব্দ আসে, তারা প্রেসিডেন্টের চারপাশে প্রতিরক্ষামূলক বলয় তৈরি করে। আরেক সাবেক সিক্রেট সার্ভিস কর্মকর্তা ব্যারি ডোনাডিও বলেন, ইভেন্টে পর্যাপ্ত সংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে ট্রাম্পের ইভেন্টগুলোতে নিরাপত্তা আরও কঠোর করা হবে, বিশেষ করে নিরাপত্তা বলয় আরও বড় করা হতে পারে।
এই গুলিবর্ষণের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আবারও সামনে এনেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মার্কিন ক্যাপিটল পুলিশ ৮ হাজারের বেশি হুমকির তদন্ত করেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
এর আগে রাজনৈতিক সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে- ইউটাহতে চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড, মিনেসোটায় আইনপ্রণেতা ও তার স্বামীকে হত্যা, পল পেলোসির ওপর হামলা এবং কংগ্রেসের অনুশীলনের সময় গুলিবর্ষণের ঘটনা।
১৯৮১ সালে রোনাল্ড রিগানসহ একাধিক প্রেসিডেন্ট হত্যাচেষ্টার শিকার হন। ঘটনাস্থল ছিল ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলের বাইরে, একই জায়গা যেখানে এই নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ট্রাম্প বলেন, তিনি হত্যাচেষ্টার ইতিহাস অধ্যয়ন করেছেন এবং আব্রাহাম লিংকনের মতো প্রেসিডেন্টদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, তারা বড় নাম। এটা শুনে খারাপ লাগে, কিন্তু আমি যা করেছি, তার কারণে আমি এটাকে একভাবে সম্মান হিসেবে দেখি।









