দক্ষিণ এশিয়ার সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ এবং আফ্রিকা মহাদেশের প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশর—দুটি ভিন্ন ভূগোল ও সংস্কৃতির দেশ। লোহিত সাগর ও নীলনদের তীরে অবস্থিত মিশরের রাজধানী কায়রোসহ বিভিন্ন শহরে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস।
পড়াশোনা, জীবিকা ও পেশাগত দায়িত্বে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করলেও, প্রবাসের মাটিতে তারা লালন করে চলেছেন নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। এই ধারাবাহিকতায় নববর্ষের আবহে নতুন স্বপ্ন, উদ্যম ও প্রত্যাশাকে ধারণ করে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মিশরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ণাঢ্য বৈশাখী মেলা ও পিঠা উৎসব।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবাসিক ছাত্রাবাসের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিশরে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ।
আবদুল্লাহ আল মারুফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাইখুল আজহার ড. আহমাদ আত-তাইয়্যেবের আন্তর্জাতিক ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও মারকাজুত তাতবিরের প্রধান ড. নাহলা সাইদি।
এছাড়া আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদিনাতুল বু’উস আল-ইসলামিয়ার (আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আবাসন) প্রধান ইসাম আল-কাদি।

বিকেল ৩টা থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজনে রঙ-বেরঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি ও সালওয়ার-কামিজে সজ্জিত নারী-পুরুষ ও শিশুদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি, দেশীয় পিঠা-পায়েসের বাহারি আয়োজন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সব মিলিয়ে পুরো স্টেডিয়াম যেন রূপ নেয় এক ক্ষুদ্র বাংলাদেশে।
উৎসবে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলির পাশাপাশি রসমালাই, লাড্ডু, জিলাপি, বিভিন্ন মিষ্টান্ন এবং জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার যেমন ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি ও নানান রকমের আচারের পসরা সাজিয়ে বসেন প্রবাসী উদ্যোক্তারা।
প্রধান অতিথি রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ প্রতিটি স্টল পরিদর্শন করেন, উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাদের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা উপভোগ করেন এবং বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রবাসে থেকেও বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ ও চর্চার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি আরও অনুপ্রাণিত করে। এ সময় তিনি বিদেশি শিক্ষার্থী ও অতিথিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং বাংলাদেশের সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরেন।
বিশেষ অতিথি ইসাম আল-কাদি বলেন, বিদেশের মাটিতে নিজস্ব সংস্কৃতি লালন ও উদযাপন করা দেশপ্রেমের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
অনুষ্ঠানের সভাপতি সাইফুর রহমান রাষ্ট্রদূতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তিনি সবসময় ছাত্রবান্ধব মনোভাব নিয়ে আমাদের পাশে থাকেন, যা প্রবাসজীবনে বড় প্রেরণা জোগায়। আহ্বায়ক মিনহাজ সামি দল-মত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানান।

যুগ্ম আহ্বায়ক মিরাজুর রহমান বলেন, প্রবাসে এমন আয়োজন আমাদের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। সদস্য সচিব সালেহ আল ইসলাম খেলাধুলায় অংশগ্রহণকারী সবাইকে অভিনন্দন জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে ক্রিকেট ও ফুটবলসহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, একক সংগীত পরিবেশনা এবং নারী, পুরুষ ও শিশুদের অংশগ্রহণে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। শিশু-কিশোর ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।
এতে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশগ্রহণ করেন।
এ ধরনের উৎসবমুখর আয়োজন প্রবাসজীবনের নিঃসঙ্গতা ও প্রিয়জন থেকে দূরে থাকার বেদনা অনেকটাই লাঘব করে। পহেলা বৈশাখের এই উৎসব যেন প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশকেই জীবন্ত করে তোলে।









