১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। পূর্ব পাকিস্তানে শক্ত অবস্থান নিয়েছে ভারতীয় বাহিনী। বাংলাদেশের অভ্যুদয় তখন কেবল সময়ের ব্যাপার। ঠিক সেই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন গোপনে চীনকে একটি বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি চীনকে আশ্বস্ত করেছিলেন, তারা যদি ভারত আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র বেইজিংয়ের পাশে থাকবে।
দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে গোপন রাখা ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির গ্র্যান্ড জুরির জবানবন্দি থেকে সম্প্রতি এই তথ্য সামনে এসেছে। নিক্সনের জবানবন্দির ওই সাতটি পাতা এতদিন সিলগালা করা ছিল।
প্রকাশিত নথিতে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার এই যুদ্ধকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে কতটা প্রস্তুত ছিল। চীনকে জড়িয়ে সংঘাত উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। নিক্সন ঠিক কী বলেছিলেন?
জবানবন্দিতে নিক্সন যুদ্ধের সময় বেইজিংকে দেওয়া গোপন প্রতিশ্রুতির কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর জবানবন্দির ভাষ্য ছিল এমন, ‘রাশিয়া তখন ভারতকে সমর্থন দিচ্ছিল। অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কারণে পাকিস্তান কারও সহায়তা পাচ্ছিল না। তবে আমরা (যুক্তরাষ্ট্র) তাদের নৈতিক সমর্থন দিচ্ছিলাম। সেই সঙ্গে আমরা গোপনে চীনকে কথা দিয়েছিলাম যে ভারত যদি পাকিস্তানে হামলা চালায় আর চীন যদি ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আমরা তাদের (চীনকে) সমর্থন দেব।’
নিক্সন বলেন, এটি কোনো সাধারণ আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এমনকি তাঁর অন্যতম পরামর্শদাতা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারও এ সিদ্ধান্ত নেননি।
কেন গোপন রাখা হয়েছিল এই জবানবন্দি?
সাত পৃষ্ঠার এই জবানবন্দি এতটাই স্পর্শকাতর ছিল যে, ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির তদন্তকারী বা এমনকি গ্র্যান্ড জুরির সদস্যদের কাছেও তা প্রকাশ করা হয়নি। কঠোর নির্দেশ ছিল, এই নথি যেন কোনোভাবেই প্রকাশ্যে না আসে। এটি আলাদাভাবে সিলগালা করে ক্লাসিফায়েড হিসেবে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস এই নথি প্রকাশ করেছে।
মূলত আশঙ্কার জায়গাটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধ নিয়ে। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, এই তথ্য ফাঁস হলে বিশ্বজুড়ে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, একটি চলমান যুদ্ধের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র গোপনে চীনকে ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিতে উসকানি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। সেই সময়ে এই তথ্য জানাজানি হলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারত।
স্বয়ং নিক্সন তদন্তকারীদের এই বিষয়ে প্রশ্ন না করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, এই প্রসঙ্গ না তোলাই ভালো, এতে ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ বেরিয়ে আসতে পারে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে নিক্সন দেখেছিলেন পুরোপুরি স্নায়ুযুদ্ধের আঙ্গিকে। ওই বছরের শুরুর দিকে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি মৈত্রী চুক্তি হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ আরও বাড়ে যে, ভারতের অবস্থান পুরোপুরি সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে।
অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তান ছিল কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। এর কারণ, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনে পাকিস্তান ‘গোপন চ্যানেল’ হিসেবে কাজ করছিল। এই কূটনৈতিক তৎপরতার ফল হিসেবেই ১৯৭২ সালে নিক্সন ঐতিহাসিক বেইজিং সফরে যান।
জবানবন্দিতে নিক্সন উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের এই ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তাদের প্রতি ‘বড় ধরনের দায়বদ্ধতা’ ছিল। তাঁর ভয় ছিল, ওই সময়ে পাকিস্তানের পাশ থেকে সরে গেলে চীনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হবে।
শুধু কোনো ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়; ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্ট মানবিক ও কৌশলগত সংকটের ফল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের রায়ের পর পাকিস্তানি বাহিনী যখন নির্মম দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন লাখ লাখ বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। এটি ভারতের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
ভারত শুরুতে ইসলামাবাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ায়, ভারত ১৯৭১ সালের আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি সই করে। এরপর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান বিমান হামলা চালালে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়।
পূর্ব ফ্রন্টের এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ১৩ দিন। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযানের মুখে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যই বদলে দেয়। চীন কি যুক্তরাষ্ট্রের কথায় সাড়া দিয়েছিল?
শেষ পর্যন্ত চীন অবশ্য সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের।
তবে প্রকাশিত জবানবন্দি থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, চীন হস্তক্ষেপ করলে যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিল। প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও গোপনে তারা ভারতের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিল। যুদ্ধের সময় বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌবহর (সপ্তম নৌবহর) পাঠানোর ঘটনাও ছিল সেই পরিকল্পনারই অংশ। তখন একে ভারতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট হুমকি হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
এই নতুন তথ্য ভারতের দীর্ঘদিনের অভিযোগকে নতুন করে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। বরাবরই ভারতের দাবি ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে ভারতের লক্ষ্যের বিরোধিতা করেছে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, ওই সময় দক্ষিণ এশিয়া কতটা বড় সংঘাতের মুখে ছিল। একাধিক পরাশক্তি জড়িয়ে পড়লে যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। পর্দার আড়ালে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে পারত। – টাইমস অফ ইন্ডিয়া










