কুয়েতে চিরুনী অভিযান: আইন প্রয়োগ না আতঙ্কের ছায়া?

কুয়েতজুড়ে এখন আলোচিত বিষয় চিরুনী অভিযান। রাজধানী কুয়েত সিটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন গভর্নরেট, শিল্প এলাকা, এমনকি দূরবর্তী আবাসিক অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি। পুলিশের পাশাপাশি বাণিজ্য, পৌরসভা, শ্রম ও অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন।

বহু প্রবাসী এই অভিযানের খবর শুনে উদ্বিগ্ন, কেউ কেউ আতঙ্কিত। আবার কেউ মনে করছেন এটি একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। যা দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটাবে।


সত্যি বলতে কী, কুয়েতে বসবাসরত প্রবাসীদের জীবনযাত্রার ভেতরে এমন কিছু চিত্র রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে চলছিল। কুয়েতের আইন অনুযায়ী, আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তব চিত্র অন্যরকম। বহু ভবনে রেস্টুরেন্ট, বাকালা (মুদির দোকান), গ্যারেজ বা ছোটখাটো ওয়ার্কশপ চালু আছে বছরের পর বছর।

এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা কাজ করেন, অনেকেই বৈধ অনুমতি ছাড়াই। কুয়েতের আইন অনুযায়ী যেখানে বসবাসের অনুমতি, সেখানে ব্যবসা নয়। অথচ বাস্তবে এই লঙ্ঘন এতটাই সাধারণ হয়ে উঠেছিল যে, কেউ আর একে আইনভঙ্গ হিসেবেই ভাবতেন না।


এখন সেই চিরাচরিত ধারণা ভেঙে দিচ্ছে প্রশাসনের অভিযান। অন্য একটি বড় সমস্যা হচ্ছে আবাসিক ভবনের অতিরিক্ত জনসংখ্যা। অনেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় বসবাস করছেন, কেউ বা অন্যের নামে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়ায় অন্যদের সাবলেট দিয়েছেন। অনেক পুরনো, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে এক কক্ষে পাঁচ ছয়জন গাদাগাদি করে থাকেন, যা শুধু অস্বাস্থ্যকরই নয়, বড় বিপদের কারণও বটে।


সম্প্রতি এক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু প্রাণহানির পর প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। বলা যায়, এই ঘটনাই চিরুনী অভিযানের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা সুরক্ষা বিভাগ সম্প্রতি এক অভিযানে ১,০০০ এর বেশি জাল পণ্য জব্দ করেছে। প্রশাসনের দাবি, এসব অভিযান প্রতিদিন চলবে, যতদিন না বাজার ভেজালমুক্ত হয়। এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভোক্তা ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।

কারণ জাল ও ভেজাল পণ্য শুধু ক্রেতার ক্ষতি করে না, বরং দেশের সুনামকেও কলঙ্কিত করে। তবে এর মাঝেই দেখা যাচ্ছে বহু দোকান বা গুদামঘরে কাজ করা শ্রমিকরা জানেনই না তারা যে পণ্য বিক্রি করছেন তা আইনবহির্ভূত।

চলমান অভিযানে ট্রাফিক আইনেও কঠোরতা এনেছে কুয়েত সরকার। ফলাফলও মিলছে, দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে এসেছে। তবে কিছু প্রবাসী অভিযোগ করছেন, সামান্য ভুলেও বড় অংকের জরিমানা গুনতে হচ্ছে। কঠোর আইন হয়তো অনেকের কাছে অসুবিধার, কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্তই হলো আইন মেনে চলা।


এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসী সমাজে এখন দুটি ভাবধারা স্পষ্ট। এক দল বলছে, অভিযানটি প্রবাসীদের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। অন্য দল বলছে, এই ভয়টাই দরকার ছিল, যাতে সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। প্রশাসনেরও বক্তব্য স্পষ্ট আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেই ভয়ের কারণ নেই।

তারা চান, কুয়েত যেন নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়  যেখানে কেউ অবৈধভাবে বসবাস বা ব্যবসা করার সুযোগ না পায়।

  • Related Posts

    মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব: ১০ দিনে শাহজালালে ৩২০ ফ্লাইট বাতিল

    মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আজ রোববার (৮ মার্চ) পর্যন্ত ৩২০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৮…

    Continue reading
    নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি দিয়েছেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি

    স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই ভিত্তিকে আরও…

    Continue reading

    মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব: ১০ দিনে শাহজালালে ৩২০ ফ্লাইট বাতিল

    মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব: ১০ দিনে শাহজালালে ৩২০ ফ্লাইট বাতিল

    নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি দিয়েছেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি

    নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তি দিয়েছেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি

    ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন, নাম এখনো ঘোষণা হয়নি

    ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন, নাম এখনো ঘোষণা হয়নি

    নিউইয়র্কে মামদানির বাড়ির সামনে মুসলিমবিরোধী বিক্ষোভ, ‘বিস্ফোরক’ নিক্ষেপ

    নিউইয়র্কে মামদানির বাড়ির সামনে মুসলিমবিরোধী বিক্ষোভ, ‘বিস্ফোরক’ নিক্ষেপ

    উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড

    উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড

    আর এক গোলেই ইতিহাস, মেসির গোলে মিয়ামির জয়

    আর এক গোলেই ইতিহাস, মেসির গোলে মিয়ামির জয়

    স্টার হোটেলের ‘সন্ত্রাসী’ কর্মচারীদের গ্রেফতার ও শাস্তি চাইলেন আরশ খান

    স্টার হোটেলের ‘সন্ত্রাসী’ কর্মচারীদের গ্রেফতার ও শাস্তি চাইলেন আরশ খান

    মালদ্বীপে বাংলাদেশ মিশনের ইফতার মাহফিল

    মালদ্বীপে বাংলাদেশ মিশনের ইফতার মাহফিল

    নারীর নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী

    নারীর নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: প্রধানমন্ত্রী

    ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ডোনাল্ড ট্রাম্প

    ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ডোনাল্ড ট্রাম্প