ফরাসি উপকূল থেকে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পথে তিনটি পৃথক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন দুই নারীসহ চার অভিবাসী এবং নিখোঁজ রয়েছেন তিনজন।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুরে খাবারের সময় ‘চ্যানেলে বিপদগ্রস্ত একটি অভিবাসীবাহী নৌকার খোঁজ পেয়ে’ উদ্ধারে ছুটে যায় ব্রিটিশ বর্ডার ফোর্সের একটি দল।
সরকারের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, অভিবাসীবাহী নৌকাটিতে ‘একজন যাত্রীকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তাকে সিপিআর দেওয়া হয়।’
কিন্তু ওই নারী অভিবাসীকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের ওই মুখপাত্র বলেন, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা হতবাক এবং দুঃখিত।’
ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তা আবারো প্রমাণিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘আমরা এসব দুর্বল মানুষদের (অভিবাসী) প্রতি শোষণ বন্ধে নিষ্ঠুর অপরাধীদের (মানবপাচারকারী) ভেঙে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের কেন্টের পুলিশ জানিয়েছে, ওই নারী অভিবাসীকে অচেতন অবস্থায় বিমানে করে তীরে আনা হয়। সেখানে আনার পরই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।
পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত করছেন কর্মকর্তারা।
ফরাসি উপকূলে প্রাণ হারালেন তিন জন
ফ্রান্সের কর্মকর্তারা বুধবার সকালে জানিয়েছেন, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার চেষ্টারত দুটি পৃথক ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন।
পা-দ্য-কালে অঞ্চলের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা লরঁ তুভে বুধবার সকালে জানিয়েছেন, নিহত তিন জনের মধ্যে একজন নারী এবং দুইজন পুরুষ।
সাংবাদিকদের তিনি আরও জানান, নিহত অভিবাসীরা বয়সে তরুণ ছিলেন। তারা তিনজন নৌকার নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার ভোর ৫টার দিকে দুর্ঘটনার পর নৌকাটি থেকে অভিবাসীদের উদ্ধার করে বুলোন-সুর-মের বন্দরে নিয়ে আসে ফরাসি উদ্ধারকারীরা।
এ সময় নৌকায় চাপা পড়া তিনজনকে দেখতে পান উদ্ধারকর্মীরা। তাদের তিন জনকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানেই কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
বুলোন-সুর-মেরের প্রসিকিউটর সেসিল গ্রেসিয়ে জানিয়েছেন, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এছাড়া, মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাজ্যমুখী একটি নৌকা থেকে চারজন অভিবাসী সমুদ্রে পড়ে যান। তাদের মধ্যে একজনকে বাঁচানো সম্ভব হলেও নিখোঁজ হয়েছেন তিন জন।
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, মঙ্গল ও বুধবারে চার অভিবাসীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চলতি বছরে ইংলিশ চ্যানেল প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন।
রাজনৈতিক চাপে ব্রিটিশ সরকার
আগস্টে ইংলিশ চ্যানেলে যুক্তরাজ্যমুখী অভিবাসীবাহী নৌকার সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু সম্প্রতি তা আবারও বেড়েছে। বিশ্বের ব্যস্ততম এই শিপিং লেন পাড়ি দিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৩০ হাজারের বেশি অভিবাসী যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন।
নানা উদ্যোগের পরও ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসীবাহী নৌকা থামানো যাচ্ছে না। তা নিয়ে বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ সরকার। আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেলে রাখার বিরোধিতা করেও বিক্ষোভ করেছে দেশটির মানুষ। ফলে, অতি ডানপন্থি ও অভিবাসন বিরোধী নেতা নাইজেল ফারাজের দল রিফর্ম ইউকে-এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সরকার বিষয়টি স্বীকার করেনি। গত সপ্তাহে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে আসা শাবানা মাহমুদকে।
রোববার তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্যের সীমান্ত রক্ষা করা আমার অগ্রাধিকার।’
ব্রিটিশ অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সব বিকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শাবানা মাহমুদ। এমনকি, অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত নিতে যেসব দেশ রাজি হবে না, সেসব দেশের জন্য ভিসা নীতিও কঠোর বা বাতিল করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এদিকে, ফ্রান্সের সঙ্গে সম্প্রতি করা অভিবাসী প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত ‘ওয়ান ইন ওয়ান আউট’ চুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীদের ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর কাজটিও দ্রুত শুরু করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
এই চুক্তির আওতায় ফরাসি উপকূল থেকে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীদের আটক করে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হবে। বিনিময়ে সমান সংখ্যক অভিবাসীকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে নিয়মিত পথে যুক্তরাজ্যে আসার সুযোগ দেওয়া হবে।









