ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া অনলাইন ক্ষোভ এখন বিরাট আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দিল্লির রাজপথে হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীর এই আন্দোলন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে। আন্দোলন শুধু শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। বিক্ষোভকারীরা এখন সরাসরি মোদী সরকারের জবাবদিহি দাবি করছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, কয়েকটি কারণে এই আন্দোলন আগের বিক্ষোভগুলোর তুলনায় ভিন্ন এবং তা সরকারকে নতুন চাপে ফেলেছে।
১. আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এখন মোদী
প্রথম দিকে আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। তবে ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা এবং নিয়োগ ব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় নিয়ে এখন আন্দোলনকারীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদীকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের মতে, শুধু মন্ত্রী পরিবর্তন নয়, পুরো শাসনব্যবস্থার জবাবদিহি প্রয়োজন।
২. সংগঠনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যুবসমাজের আন্দোলন
প্রথমে অনলাইনভিত্তিক একটি প্রচারণা থেকে আন্দোলনের সূচনা হলেও বর্তমানে এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-যুব আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। জন্তর-মন্তর ও সংসদমুখী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অনেকেই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে নয়, নিজ উদ্যোগে যোগ দিয়েছেন। এ কারণে এই আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট নেতৃত্বের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বা সমঝোতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৩. পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল কার্যকর হয়নি
আগের বিভিন্ন আন্দোলনের ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা রাজনৈতিক তকমা দিয়ে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান আন্দোলন চাকরি, পরীক্ষা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের উদ্বেগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে একে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৪. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা
বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশের দাবি, আদালত, পার্লামেন্ট এবং মূলধারার গণমাধ্যম তাদের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। তাদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক পথ ব্যর্থ হওয়ায় রাজপথই এখন দাবি আদায়ের একমাত্র উপায়।
৫. সরকারের জবাবদিহির দাবি
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের মধ্যে সরকার থেকে কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানতে চাইছেন, বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় কার, কী সংস্কার হবে এবং কেন কোনো মন্ত্রী দায় স্বীকার করছেন না।
৬. সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার এখন পর্যন্ত নীরবতা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু আন্দোলন অব্যাহত থাকায় এই কৌশল কার্যকর হচ্ছে না বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
৭. ভয় কাটিয়ে রাজপথে মানুষ
হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন, নজরদারি এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের পরও বিপুলসংখ্যক মানুষ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ভয় কাটিয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসায় এই আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাদের ভাষ্য, বিভাজন বা ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমন করা এবার সহজ হবে না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সরকারি জবাবদিহি এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর জনঅসন্তোষের প্রতিফলনে পরিণত হয়েছে।









