ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর টানা দুই মেয়াদে লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আইন পাসে বড় কোনো বাধা তৈরি হয়নি।
কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে বদলাতে শুরু করে সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা। আর সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
২০২৪’র নির্বাচনে প্রথম বড় ধাক্কা
‘আব কি বার, ৪০০ পার’ স্লোগান তুলে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বড় জয়ের লক্ষ্য নিয়েছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ। বিজেপি একাই ৩৭০টি আসন জয়ের লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল সেই প্রত্যাশা পূরণ করেনি।
বিজেপি পায় ২৪০টি আসন, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২ আসনের চেয়ে ৩২টি কম। ফলে শরিক দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে হয় নরেন্দ্র মোদীকে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর এটিই ছিল বিজেপির সবচেয়ে দুর্বল লোকসভা নির্বাচনি ফলাফল।
উত্তরপ্রদেশসহ হিন্দিভাষী অঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যে বিজেপির আসন কমে যায়। অন্যদিকে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে সংসদে বিজেপির একক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটে।
ভারতের লোকসভায় মোট আসন সংখ্যা ৫৪৫টি। কোনো দলকে সরকার গঠন করতে হলে প্রয়োজন হয় ২৭২টি আসন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি ২৮২টি আসনে জয় লাভ করে। অন্যদিকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস তখন মাত্র ৪৪টি আসনে জয় লাভ করে। দলটির বর্তমান নেতৃত্বে রয়েছেন রাহুল গান্ধী। এরপর ২০১৯ সালে বিজেপির নাটকীয় উত্থান ঘটে। সে সময় দলটি লোকসভায় ৩০৩টি আসনে জয় পেয়েছিল। অন্যদিকে কংগ্রেস পায় ৫২টি আসন।
তাছাড়া মোদীর নিজের জনপ্রিয়তাই কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বারাণসীতে মোদী জিতেছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ৫১৩ ভোটের ব্যবধানে। ২০১৯ সালের নির্বাচনে তার জয়ের ব্যবধান ছিল ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৫ ভোট। আর ২০১৪ সালে প্রথমবার বারাণসী থেকে জয়ের সময় তিনি ৩ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৪ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
ভারতে জেন-জি আন্দোলন
বিরোধীরা আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে
বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ভারতের বিরোধী রাজনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে বিরোধীদের অনেক সিদ্ধান্ত কার্যত উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল, এখন সংসদে তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের বিভিন্ন বিল ও নীতির বিরোধিতা করতে একাধিক দল একসঙ্গে অবস্থান নিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরিক দলগুলোর সমর্থনও এখন সরকারের জন্য অপরিহার্য।
ফলে মোদী সরকারকে আগের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক সমঝোতা করতে হচ্ছে। এই পরিবর্তনকে ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন অনেকে।
তরুণদের আন্দোলনে নতুন চ্যালেঞ্জ
মোদী সরকারের জন্য সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এসেছে তরুণদের কাছ থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ দিপকের একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে গড়ে ওঠে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
প্রথমে এটি ছিল একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভকে কেন্দ্র করে দ্রুত এটি বাস্তব আন্দোলনে পরিণত হয়।
ভারতের লাখো শিক্ষার্থীর কাছে সরকারি চাকরি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান সুযোগ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে এসব পরীক্ষায় অংশ নেন।
পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে বা শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা বাতিল হলে তাদের মধ্যে তৈরি হয় গভীর হতাশা। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়, বরং পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার একমাত্র সুযোগ।
এই ক্ষোভই সিজেপির আন্দোলনকে দ্রুত শক্তিশালী করে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে আন্দোলনের সাফল্য
সিজেপির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা না নেওয়া।
টানা কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লির যন্তর মন্তরে আনন্দে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে মাইক্রোফোন হাতে ঘোষণা করেন, আমরা পেরেছি। এরপর প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের নাম পড়ে শোনান তিনি এবং আন্দোলনের সাফল্য তাদের উৎসর্গ করেন।
এই ঘটনা ভারতের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। সংগঠিত জনআন্দোলন এখনো সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
পুলিশের অভিযানে আন্দোলন আরও তীব্র
আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পর্যায় আসে যখন সিজেপির কর্মী-সমর্থকরা সংসদ অভিমুখে মিছিল করেন। দিল্লি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর বহু মানুষ আহত হন।
পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা সহিংস আচরণ করেছেন, নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন এবং সরকারি যানবাহন ও সম্পত্তির ক্ষতি করেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে শতাধিক সদস্য আহত হওয়ার কথা জানানো হয়।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে তারা দাবি করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের অভিযানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। বেঙ্গালুরু, জয়পুর, লখনউ, মুম্বাই ও পাটনাসহ বিভিন্ন শহরে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ হয়।
ভারতে জেন-জি আন্দোলন
রাহুল গান্ধীর অবস্থান ও বিরোধীদের নতুন সুযোগ
এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অভিযানের প্রতিবাদে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
তার সঙ্গে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা। পরে পুলিশ তাদের আটক করে সরিয়ে নেয়।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুধু একটি আন্দোলনের ওপর আঘাত নয়; এটি দেশের তরুণদের ভবিষ্যতের ওপর আঘাত। তার মতে, চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার পর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই ছিল তরুণদের প্রধান ভরসা। সেই পরীক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তাদের সামনে আর কোনো পথ থাকে না।
এই অবস্থান কংগ্রেসের জন্যও নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর পর দলটি পরবর্তীসময়ে একাধিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। তরুণদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে রাহুল গান্ধী আবারও বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন।
ভারতের রাজনীতিতে ধর্ম, জাতপাত ও জাতীয়তাবাদ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস ও চাকরির সংকটের মতো বিষয় তরুণদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের ঐক্য তৈরি করেছে।
উত্তরপ্রদেশের একজন হিন্দু শিক্ষার্থী এবং দক্ষিণ ভারতের একজন মুসলিম শিক্ষার্থী—দুজনই একই সমস্যার শিকার হতে পারেন। ফলে শিক্ষা, চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের ক্ষোভ ধর্মীয় বিভাজন অতিক্রম করেছে। এটাই সিজেপির আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ভারতের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সালে। তাই এখনই ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট তা হলো মোদী সরকারের দীর্ঘদিনের অজেয় ভাবমূর্তিতে ফাটল ধরেছে।
২০২৪ সালে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো, সংসদে বিরোধীদের শক্তিশালী হয়ে ওঠা এবং তরুণদের আন্দোলনের সাফল্য। সব মিলিয়ে বিজেপির সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টি হয়তো এখনই নির্বাচনি রাজনীতিতে বড় শক্তি নয়। কিন্তু তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখিয়ে দিয়েছে তা হলো ভয়হীন ও ঐক্যবদ্ধ নাগরিকরা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
মোদী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু প্রতিষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দল নয়। বরং এমন এক তরুণ প্রজন্ম, যারা নিজেদের শিক্ষা, চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছে। কোনো সরকার যতই শক্তিশালী হোক, নাগরিকরা যখন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন, তখন কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষেই চিরকাল অজেয় থাকা সম্ভব নয়।









