রাজধানী কায়রোতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও রাসুলপ্রেমের আবহে অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাওলিদ সেমিনার, শামায়েলে মুহাম্মাদিয়্যাহ পাঠ, হিফজুল হাদিস প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগঠন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ বাংলাদেশ, মিশর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দরুদ ও সালামের ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে কায়রোর ত্বাকি স্কয়ারের নাদি আল-মিয়াহ কনফারেন্স সেন্টার।
সাইমুম আল-মাহদী আজহারী ও ওমাইর উদ্দিন ওমর আজহারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং রাসুল প্রেমে নিবেদিত আবেগঘন নাত পরিবেশন করা হয়। এতে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অতিথিদের মধ্যে সৃষ্টি হয় গভীর ধর্মীয় অনুভূতি ও আত্মিক আবেশ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ বাংলাদেশ, মিশর-এর সভাপতি সাইফুর রহমান আল-আজহারী। প্রধান অতিথি ছিলেন আমেরিকান মুসলিম অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট শাইখ সাইফুল আজম বাবর আল-আজহারী। বিশেষ অতিথি ছিলেন মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে এবং ১ম সচিব মো. জাকির হোসাইন।

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত আলেম ড. আবদেল ফাত্তাহ আল-আওয়ারি এবং প্রফেসর ড. সুবহি আবদেল ফাত্তাহ রাবি। অতিথিরা অনুষ্ঠান স্থলে পৌঁছালে তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানান সংগঠনের নেতারা।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত বরেণ্য ইসলামি ব্যক্তিত্ব শাইখ সাইফুল আজম বাবর আল-আজহারীর বক্তব্য শোনার জন্য পুরো মিলনায়তনে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। তিনি প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, আদর্শ, চরিত্র ও উম্মতের প্রতি তার ভালোবাসার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় আবেগঘন ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ।
অনুষ্ঠানে ‘হিফজুল হাদিস’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় কোমলমতি শিশু থেকে শুরু করে তরুণ শিক্ষার্থীরা। তাদের সাবলীলভাবে হাদিস পাঠ ও উপস্থাপনা উপস্থিত সবার প্রশংসা কুড়ায়। প্রতিযোগিতায় অসাধারণ পারদর্শিতা দেখিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন সাইফুল ইসলাম। দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন মইনউদ্দিন এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেন ওবায়দুল্লাহ খান। বিজয়ীদের সাফল্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অতিথিদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন পর্বগুলোর একটি ছিল ইমাম তিরমিজি (রহ.) রচিত ‘শামায়েলে মুহাম্মাদিয়্যাহ’ পাঠ ও খতম। আল-আজহারের প্রখ্যাত আলেম, বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী এবং নবীন-প্রবীণ আশেকে রাসুল একসঙ্গে প্রিয় নবী (সা.)-এর পবিত্র সীরাত, সৌন্দর্য, বৈশিষ্ট্য ও মহান চরিত্রের বর্ণনা পাঠ করেন। এ সময় পুরো মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ। শামায়েল পাঠ শেষে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের হাতে ঐতিহ্যবাহী ‘ইজাযাহ’ প্রদান করা হয়। আলেম ও শিক্ষার্থীদের এই মিলন অনুষ্ঠানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম দে বলেন, মিশরে অধ্যয়নরত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণ ও প্রয়োজনের বিষয়টি দূতাবাস বিশেষভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। তাদের যে কোনো সমস্যা, প্রয়োজন ও সংকটে দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক ঐক্য, সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বলেন, ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে আসছেন। শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় এই গৌরবময় ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে ভবিষ্যতেও তারা বাংলাদেশের সুনাম ও মর্যাদা আরও সমুন্নত করবেন—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যরা এবং বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের কার্যকরী কমিটির সহ-সভাপতি, সেক্রেটারি ও অন্যান্য দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া আল-আজহার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি তাজদীদ বিন ওদুদসহ বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সুন্নাহর চর্চা, হাদিসের জ্ঞানার্জন এবং ইলমি খেদমতে শিক্ষার্থীদের আরও উৎসাহিত করতে অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে হিফজুল হাদিস প্রতিযোগিতার বিজয়ী, কৃতী শিক্ষার্থী ও প্রবীণ ব্যক্তিত্বদের হাতে বিশেষ সম্মাননা, পুরস্কার ও ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। প্রবাসের মাটিতে আল-আজহারের প্রখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে এ স্বীকৃতি পেয়ে আনন্দ ও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

অনুষ্ঠানের সার্বিক সফলতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে হৃদয়গ্রাহী সমাপনী বক্তব্য দেন অনুষ্ঠানের সভাপতি সাইফুর রহমান আল-আজহারী।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি শাইখ সাইফুল আজম বাবর আল-আজহারী আবেগঘন দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন। দোয়ার সময় উম্মতের হেদায়েত, বিশ্বশান্তি, মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শাফাআত কামনা করা হয়।
মোনাজাতে অংশ নিয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দরুদ ও সালামের ধ্বনিতে মুখরিত কায়রোর সেই আয়োজন শেষ হয় তাবারুক বিতরণের মধ্য দিয়ে।









