ভ্লাদিমির পুতিন দেশকে এমন এক কানাগলিতে নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার উপায় কারও জানা নেই—এমন উপলব্ধি ছড়িয়ে পড়েছে রাশিয়ায়। গত আড়াই দশকের মধ্যে এই প্রথম দেশটিতে অভিজাত শ্রেণি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই পুতিন-পরবর্তী এক ভবিষ্যতের কথা ভাবতে শুরু করেছেন।
রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ আমলা, আঞ্চলিক গভর্নর এবং ব্যবসায়ীদের কথাবার্তার ধরনে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে যেখানে সরকারি সিদ্ধান্তকে ‘আমরা’ বা ‘আমাদের’ বলে সম্বোধন করা হতো, এখন সেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘তিনি’ বা ‘তার’ শব্দগুলো। ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর সবার সমন্বিত কোনো প্রকল্প নয়, বরং এটি কেবলই পুতিনের ব্যক্তিগত এজেন্ডা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এমনকি ক্রেমলিনের অন্দরমহলে পুতিনের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তকে ‘অদ্ভুত’ হিসেবেও বর্ণনা করা হচ্ছে।
এ পরিবর্তনকে সরাসরি বিদ্রোহ বলা না গেলেও, এটি ক্ষমতার ভেতরে মানসিক দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অর্থনীতির চাপ ও জনঅসন্তোষ
ইউক্রেন যুদ্ধকে শুরুতে একটি ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল, যা রাশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা সেই মডেল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, বর্ধিত কর, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং কঠোর সেন্সরশিপ এখন রুশদের নিত্যসঙ্গী। এটি কোনো জাতীয় যুদ্ধ নয়, অথচ এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে গোটা জাতিকে। বিনিময়ে রাষ্ট্র জনগণকে কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে পারছে না।
অভিজাত শ্রেণির অস্থিরতা
রাশিয়ার ভেতরে সম্পদের নতুন করে যে বণ্টন শুরু হয়েছে, তা দেশটির অভিজাত শ্রেণিকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। গত তিন বছরে প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন (পাঁচ লাখ কোটি) রুবল মূল্যের বেসরকারি সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছে অথবা পুতিন-ঘনিষ্ঠদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। লন্ডনের আদালত বা আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রুশ ব্যবসায়ীরা এখন দেশের ভেতরেই একটি স্বচ্ছ আইনি কাঠামোর অভাব বোধ করছেন। তারা গণতন্ত্রপ্রেমী না হলেও নিজেদের সম্পদ রক্ষায় এখন পুতিনের মর্জির বাইরে একটি টেকসই ‘রুল অব ল’ বা আইনের শাসন চান।
পরিচিতি সংকট
পুতিন চেয়েছিলেন বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিতে। কিন্তু বাস্তবে রাশিয়া এখন এমন এক বিশ্বে নিজেকে আবিষ্কার করেছে যেখানে নিয়মকানুন দুর্বল এবং কেবল পেশিশক্তিই শেষ কথা। ইউরোপ এখন রুশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠেছে। জাতিসংঘে রাশিয়ার প্রভাব কমেছে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে রাশিয়ার ‘পরিচয়’ নিয়ে। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া নিজেকে ইউরোপ বা পশ্চিমের সঙ্গে তুলনা করে সংজ্ঞায়িত করত। এখন সেই পশ্চিমের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় রাশিয়ার উন্নয়নের অভ্যন্তরীণ কোনো আদর্শিক উৎস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ
আগের সামাজিক চুক্তি ছিল—জনগণ রাজনীতিতে জড়াবে না, আর রাষ্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাবে না। পুতিন সেই চুক্তি ভেঙে ফেলেছেন। এখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেবা বা ভোগের সুযোগ দেওয়ার বদলে কেবল দমন-পীড়ন, বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষের আনুগত্য চাওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই আনুগত্য ভবিষ্যতে কী সুফল বয়ে আনবে, তার কোনো উত্তর ক্রেমলিনের কাছে নেই।
পুতিনের ‘জুগজওয়াং’ দশা
দাবার ভাষায় পুতিন এখন ‘জুগজওয়াং’ অবস্থায় আছেন। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে প্রতিটি চালই খেলোয়াড়ের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দেয়। পুতিন যতদিন ক্ষমতায় আছেন, এই ব্যবস্থা হয়তো টিকে থাকবে। কিন্তু ব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে তিনি এখন যে পদক্ষেপই নেবেন, তা হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তিনি হয়তো দমন-পীড়ন আরও বাড়াবেন বা নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন, কিন্তু তাতে ক্ষমতা ও ভবিষ্যতের মধ্যে যে বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছে, তা জোড়া লাগবে না; বরং রাশিয়ার পতন আরও রক্তক্ষয়ী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।









