জার্মানির নতুন পেনশন সংস্কারকে ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিরোধ এখন তু্ঙ্গে। বিরোধীদলসহ বড় দলগুলোর নেতৃত্বের পাশাপাশি এখন তীব্রভাবে এর পক্ষে বিপক্ষে সক্রিয় হয়েছে ক্ষমতাসীন দ্বিদলীয় জোটেরই নবীন এমপিরা।
পেনশন সংস্কারের বিরোধিতা করে জার্মানির ক্ষমতাসীন সিডিইউ (ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন) ও এসপিডি (সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি) জোটের সিডিইউ অংশের ১৮ জন তরুণ এমপি সেই জোটেরই চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্সের ক্ষমতার চেয়ারই এখন কাঁপিয়ে দিচ্ছেন।
জানা গেছে, পেনশন সংস্কার ইস্যুতে তরুণরা মনে করছেন, পেনশন সংস্কারের সিদ্ধান্ত শুধু বড় নেতাদের নেতৃত্বে নয়, যুবকদের হিসেব-নিকেশেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতের জার্মান পেনশন কাঠামো। অবসরকালীন ভাতা সংস্কার ইস্যুতে সিডিইউ দলের এ ১৮ জন তরুণ এমপির সংস্কারের দলীয় ফোরামে বিরোধিতা এখন সংসদে আইন পাসের বিরোধিতায় পৌঁছে সরকারকে নড়বড়ে অবস্থায় ফেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
যেভাবে শুরু জার্মানির পেনশন সংস্কার সংকট
বর্তমান জার্মান পেনশন ব্যবস্থায় অবসরের পর ব্যক্তির আয়ের ৪৮% পেনশন লেভেল হিসেবে নিশ্চিত থাকে। অর্থাৎ অবসরের পর একজন ব্যক্তি ৪৮ শতাংশ হারে ভাতা পেয়ে থাকেন। কিন্তু বিপুল সংখ্যক বয়স্ক জনসংখ্যার অবসর ভাতা প্রদান এবং ক্রমহ্রাসমান তরুণ কর্মশক্তির কারণে এ ব্যবস্থা আগামী দুই দশকে বড় চাপের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন জোটের সমাজতন্ত্রী এসপিডি অংশের প্রস্তাব হলো, ৪৮% পেনশন লেভেল ২০৩১-এর পরেও যেন স্থায়ী থাকে। বর্তমান সংস্কার প্রস্তাবে, ২০৩১ সালের পর এ ৪৮ শতাংশ ভাতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারে থাকা এসপিডির মন্ত্রী বেয়ারবেল বাস বলেছেন, অর্ধেকের বেশি জার্মান নাগরিক কেবল রাষ্ট্রীয় পেনশনের ওপর নির্ভর করেন। এটি আরও কমালে আমরা লাখো মানুষকে ভবিষ্যৎ দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেব।
তাহলে বিরোধ কোথায়?
বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হলো কাকে বাঁচাতে গিয়ে কাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। সরকারে থাকা সিডিইউ দলের তরুণ এমপিদের ব্লক ইয়াং ইউনিয়নের অভিযোগ, আজকের যুবকরা শুধু দিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে তারা কী পাবে, এ নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদের মতে, নতুন পেনশন সংস্কার ২০৩১ সালের পরেও ব্যয় বাড়াবে। বয়স্কদের টাকা দিতে গিয়ে তরুণদের আরও বেশি ট্যাক্স দিতে হবে। অন্যথায় এ পেনশনের টাকা দিতে গিয়ে ২০৪০ সালের মধ্যে সরকারকে ১০০ বিলিয়ন ইউরো খরচ করতে হবে। এ বোঝা ভবিষ্যৎ কর্মরত তরুণ প্রজন্মের ওপরই গিয়ে পড়বে। পেনশন ৪৮% বহাল রাখা মানে হলো, কর্মজীবীদের বেতনপ্রতি ট্যাক্স আরও বাড়বে।
অন্যদিকে জোট সরকারের সমাজতন্ত্রী তরুণ এমপিদের বক্তব্য পুরোপুরি ভিন্ন। তারা বলছেন, এটি যুবক বনাম বৃদ্ধ নয়, ধনী বনাম গরিবের ন্যায়ের লড়াই। তাদের যুক্তি, নিম্ন-আয়ের শ্রমিকরা অবসরে গেলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হন। তারা সারাজীবন কর দিয়ে যান, কিন্তু সামান্য পেনশন যা পান, তা দিয়ে তাদের শেষ জীবন ভালোভাবে চালানো সম্ভব হয় না। ৪৮% পেনশন লেভেল কমে গেলে সামাজিক বৈষম্য ভয়াবহ হবে।
জার্মান সংসদ বুন্ডেসটাগের আকার ও রাজনৈতিক ভারসাম্য
জার্মান ফেডারেল সংসদ বুন্ডেসটাগে বর্তমানে ৬৩০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এ বছরের শুরুতে গঠিত জোট সরকারে সিডিইউ দলের রয়েছে ২০৮টি আসন। আর তাদের জোটসঙ্গী সমাজতন্ত্রী এসপিডির রয়েছে ১২০টি আসন। দুই দলের মিলে মোট ২২৮টি আসন রয়েছে। যা সরকার গঠনের মার্জিন ২১৬ থেকে মাত্র ১২টি আসন বেশি। আর এ জোট সরকারের সিডিইউ দলের যুব সংগঠন ইয়াং ইউনিয়নের রয়েছেন ১৮ জন সংসদ সদস্য। যা যেকোনো বিল পাসের জন্য ও সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ ১৮ জন সমর্থন প্রত্যাহার করলে সরকারও টিকবে না আবার যেকোনো আইনের বিরোধিতা করলে তা সংসদে পাসও হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ১৮ জন এমপি এখন সংসদের সবচেয়ে বড় প্রেসার গ্রুপে পরিণত হয়েছেন। এ গ্রুপের নেতা পাসকেল রেডিগ নতুন পেনশন প্যাকেজের বর্তমান সংস্করণকে অগ্রহণযোগ্য বলে তার বিরোধিতা করছেন।
অন্যদিকে ইয়াং ইউনিয়নের মূল দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন ( সিডিইউ) ও চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্স পেনশন সংস্কারের পক্ষে। ফ্রেডরিখ মার্স বলেছেন, তরুণরা আমাদের দলের বাইরে নয়। তাদের দলের সিদ্ধান্ত মানা উচিত। সিডিইউ শুধু তরুণদের দল নয়, সব বয়স ও পেশার মানুষের দল। তাই সবার কথা বিবেচনা করেই আমাদের আইন প্রণয়ন ও সংস্কার করতে হবে। তবে, মার্সের এমন কথায় আশ্বস্ত নন তরুণরা। শেষ পর্যন্ত তরুণ এ ১৮ এমপি পেনশন সংস্কারের পক্ষে ভোট না দিলে আইন যেমন পাস হবে না, তেমনি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে নয় মাস বয়সী এ জোট সরকার।










