ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এবার বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ব্ল্যাকমেইল’-এর অভিযোগ তুলেছেন সাবেক ফিফা ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (জেএফএ) সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল হুসেইন।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, ফিফা সভাপতির প্রতি সমর্থন জানালে জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সহজ হবে- এমন বার্তা তাকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রিন্স আলী লিখেছেন, ‘জর্ডানে আমরা নৈতিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। আগে যেমন ইনফান্তিনোকে সমর্থন করিনি, এখনও করব না। পুরো পরিস্থিতিটাই এক ধরনের ব্ল্যাকমেইল এবং আমরা কখনোই এর কাছে নতি স্বীকার করব না।’
আরব কাপের প্রাইজমানি এখনও পায়নি জর্ডান
প্রিন্স আলীর অভিযোগ, ২০২৫ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত ফিফা আরব কাপে রানার্সআপ হওয়ার পরও জর্ডান এখনও তাদের প্রাপ্য অর্থ পায়নি। ওই আসরের ফাইনালে মরক্কোর কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েছিল জর্ডান। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রানার্সআপ দল হিসেবে তাদের প্রায় ৪.২ মিলিয়ন ডলার প্রাইজমানি পাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও সেই অর্থ এখনও পরিশোধ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন জর্ডান ফুটবল প্রধান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দল ফাইনালে ওঠার জন্য যে অর্থ পাওয়ার কথা, সেটি এখনও দেওয়া হয়নি। অথচ ফিফা নিয়মিত বলছে, তাদের রিজার্ভে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রয়েছে।’
তার ভাষায়, ‘সমস্যাটা অর্থের নয়, নেতৃত্বের। কয়েক মাস ধরে ফিফা শুধু এই বিষয়েই নয়, অন্য অনেক ক্ষেত্রেও আমাদের সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।’
বিশ্বকাপ চলাকালেই আসে সমর্থনের বার্তা
প্রিন্স আলীর দাবি, ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালেই তাকে জানানো হয়েছিল, যদি তিনি ইনফান্তিনোর পক্ষে অবস্থান নেন, তাহলে তা জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ফিফার ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। যদিও অভিযোগের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সম্প্রতি ফিফার বাণিজ্যিক অধিকার আংশিকভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর ভবিষ্যৎ আয়ের একটি অংশ নতুন কোম্পানির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটারনাল, যার প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনার।
তবে উয়েফা, কনকাকাফ, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং একাধিক জাতীয় ফেডারেশনের তীব্র বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় ফিফা। প্রস্তাব অনুযায়ী, সদস্য ২১১টি দেশের প্রতিটি ফুটবল ফেডারেশনকে প্রায় ২ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল, যদি তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পে সম্মতি দিত।
ফিফা নির্বাচনের আগে নতুন সংকট
আগামী ১৮ মার্চ ২০২৭, মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত হবে ফিফা সভাপতি নির্বাচন। প্রার্থিতা জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৮ নভেম্বর। একসময় ধারণা করা হচ্ছিল, ইনফান্তিনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফা নতুন প্রার্থী খুঁজছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে উয়েফা ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট, সভা ও কর্মকাণ্ড বয়কটের হুমকিও দিয়েছে। অন্যদিকে কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছে।
এশিয়াই হতে পারে নির্ধারণকারী শক্তি
বিশ্লেষকদের মতে, যদি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়, তাহলে ফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এশিয়ার ভোট। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিপরীতে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ওশেনিয়ার অনেক সদস্য এখনও তার পক্ষেই থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে জর্ডানের প্রিন্স আলীর প্রকাশ্য অভিযোগ শুধু নতুন বিতর্কই সৃষ্টি করেনি, বরং ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই অভিযোগের জবাবে ফিফা কী অবস্থান নেয় এবং আগামী নির্বাচনের আগে বিশ্ব ফুটবলের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।









