ইরানের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তিসহ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একগুচ্ছ প্রস্তাব তুলে ধরেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠককে ঘিরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
হোয়াইট হাউসে প্রায় ৯০ মিনিটের এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে কয়েক সপ্তাহের মতপার্থক্য ও উত্তেজনার পর। বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউস আলোচনাকে ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু এটিকে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ‘এখন পর্যন্ত অন্যতম সেরা আলোচনা’ বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, উভয় নেতা ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার বিষয়ে একমত।
ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে সংশয়
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ইরান ইস্যু। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে জানান, তেহরান কার্যকর কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবে বলে তিনি এখনো সন্দিহান।
জ্যেষ্ঠ ওই কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে থাকা ইরান মোকাবেলার তিনটি সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়। এগুলো হলো—কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা, নৌ অবরোধ বজায় রেখে অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে আবারও ব্যাপক সামরিক হামলায় ফিরে যাওয়া।
তিনি বলেন, কোনো একটি বিকল্পকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য নয়, বরং প্রতিটি বিকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল মূল্যায়নের লক্ষ্যেই এসব বিষয় খোলামেলা আলোচনা হয়েছে।
তেহরানের ওপর আরো চাপের আহ্বান
ইসরায়েলি কর্মকর্তার দাবি, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেছেন, ইরানের অর্থনীতি এখনো চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই সামরিক ও অসামরিক—উভয় ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা উচিত।
তার মতে, জ্বালানির সংকট, পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ সারি এবং জনঅসন্তোষ ইরানের সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীর হলে তা গণঅসন্তোষে রূপ নিতে পারে বলেও তেহরানের আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের জন্য ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালিকে তাদের ‘শেষ কার্যকর চাপের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
সিরিয়া ও তুরস্কের ভূমিকা
বৈঠকে সিরিয়ার পরিস্থিতিও আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে একটি মানচিত্র দেখিয়ে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের ছোট বাফার জোনের তুলনা করেন।
তিনি যুক্তি দেন, জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর হুমকি বিদ্যমান থাকলে দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েল তার অবস্থান বজায় রাখবে।
ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ট্রাম্প যেন ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নেন, সে কারণেই নেতানিয়াহু এ বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
সৌদি পারমাণবিক চুক্তি নিয়েও আলোচনা
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্ভাব্য বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির বিষয়টিও উঠে আসে।
ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প এই চুক্তিকে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। শুধু জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি দেখা গেলে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানাবে।
প্রতিবেদন বলা হয়, নেতানিয়াহু আগামী এক দশকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনাও ট্রাম্পের সামনে তুলে ধরেন। তার মতে, ইসরায়েলের উচিত প্রতিরক্ষা খাতে আরো স্বনির্ভর হওয়া এবং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর কম নির্ভরশীল থাকা।
এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করতে চান তিনি। প্রস্তাবিত চুক্তিতে ১৬ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি সামরিক সহায়তার পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচির জন্য অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ভবিষ্যৎ অস্ত্র প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ ১৬ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন নেতানিয়াহু বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।









