১৯৬৫ সালের ইমিগ্রেশন আইন পুনর্মূল্যায়নের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে পরিবার বনাম মেরিটভিত্তিক অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থক রক্ষণশীল নীতিনির্ধারক ও অভিবাসন সংস্কারপন্থীদের একাংশের দাবি, বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের তুলনায় পারিবারিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে,

যা শ্রমবাজার, অর্থনীতি এবং সামাজিক অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় তারা শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অবদানকে ভিত্তি করে একটি মেরিটভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কাঠামোর ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯৬৫ সালের অভিবাসন আইন “ইমিগ্রেশন এন্ড ন্যাশনালিটি এক্ট” মাধ্যমে। এই আইনের ফলে পারিবারিক পুনর্মিলনকে অভিবাসনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রিন কার্ড পান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনের স্পন্সরশিপের মাধ্যমে।

সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থায় আবেদনকারীর শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে গৌণ হয়ে পড়ে।

অভিবাসন নীতিমালা সংস্কারের সমর্থকরা বলছেন, একটি দেশের অভিবাসন নীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তাদের মতে, পরিবার একত্রিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রত্যেক অভিবাসীর বিস্তৃত পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নীতি কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত নয়।

তারা আরও দাবি করেন, বর্তমানে চালু কিছু কর্মসূচি এই চাপ আরও বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ডাইভার্সিটি ভিসা লটারির সমালোচনায় বলা হচ্ছে, প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ শুধুমাত্র ভাগ্যের ভিত্তিতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পান, যেখানে দক্ষতা বা অর্থনৈতিক অবদান রাখার সক্ষমতার মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক নয়।

অভিবাসন নীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের একটি বড় অংশকে নির্বাচিত করা হয়েছে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে, দক্ষতা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। তাদের দাবি, এর ফলে নিম্নদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা ও সরকারি সেবার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, পরিবারভিত্তিক অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা উল্লেখ করেন, বহু সফল উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং ব্যবসায়ী প্রথমে পরিবারভিত্তিক ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে এসে পরবর্তীতে দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।

তবুও মেরিটভিত্তিক অভিবাসনের পক্ষে আলোচনা ও চাপ ক্রমশ বাড়ছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আবেদনকারীদের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, বয়স এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অবদানের ভিত্তিতে পয়েন্ট নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। সর্বোচ্চ পয়েন্টপ্রাপ্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অভিবাসনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই ধরনের পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা দাবি করেন, এতে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণ করা সহজ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই মেরিটভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দেন, আধুনিক অর্থনীতির জন্য উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ অভিবাসী প্রয়োজন, যারা দ্রুত শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে কর প্রদান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।

প্রস্তাবিত সংস্কারের আওতায় নিম্নদক্ষ অভিবাসন সীমিত করা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আমেরিকান মূল্যবোধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার প্রদান এবং বিদেশি শ্রমিকের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীদের প্রতিস্থাপনের সুযোগ কমানোর বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে আশ্রয়, শরণার্থী এবং অস্থায়ী সুরক্ষা কর্মসূচির সংস্কারের কথাও আলোচনায় রয়েছে। সমর্থকদের মতে, এসব কর্মসূচি মানবিক সংকটে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সীমিত থাকা উচিত এবং অর্থনৈতিক অভিবাসনের বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়।

অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়ন করা যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অভিবাসন নীতির মানবিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তার বৈচিত্র্য, পরিবারভিত্তিক সামাজিক কাঠামো এবং মানবিক মূল্যবোধের মধ্যেই নিহিত।

কংগ্রেস ভবিষ্যতে কোনো বড় অভিবাসন সংস্কার গ্রহণ করলে, সেখানে মূল বিতর্কের কেন্দ্রে থাকবে একটি মৌলিক প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি পরিবারভিত্তিক অভিবাসন কাঠামো বজায় রাখবে, নাকি মেরিটভিত্তিক ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন নীতি গঠন করবে। এই সিদ্ধান্তই আগামী দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা, শ্রমবাজার এবং অভিবাসন নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

  • Related Posts

    আওয়ামী লীগ পলিটিক্যাল নয়, মাফিয়া পার্টি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক নয় ‘মাফিয়া পার্টি’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (২০ জুন) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ…

    Continue reading
    পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করলেন ওবামা

    ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ইরান যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরে ওবামা বলেন, বিপুল ব্যয় ও প্রাণহানির পরও যুক্তরাষ্ট্র…

    Continue reading

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    আওয়ামী লীগ পলিটিক্যাল নয়, মাফিয়া পার্টি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    আওয়ামী লীগ পলিটিক্যাল নয়, মাফিয়া পার্টি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করলেন ওবামা

    পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করলেন ওবামা

    নারী-শিশুসহ ২০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা, বাধার মুখে ফেরত নিলো বিএসএফ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত

    নারী-শিশুসহ ২০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা, বাধার মুখে ফেরত নিলো বিএসএফ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত

    হাইতিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নিয়েছে ৫ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল

    হাইতিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নিয়েছে ৫ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল

    বরেণ্য ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আব্দুস সাদেকের ইন্তিকাল

    বরেণ্য  ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আব্দুস সাদেকের ইন্তিকাল

    কবে মুক্তি পাবে সিয়াম-তুষি ও চঞ্চলদের সেই সিনেমা

    কবে মুক্তি পাবে সিয়াম-তুষি ও চঞ্চলদের সেই সিনেমা

    থামছেই না জনপ্রিয়তা, নেটফ্লিক্সে ইতিহাস গড়লো ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’

    থামছেই না জনপ্রিয়তা, নেটফ্লিক্সে ইতিহাস গড়লো ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’

    আগামীকাল মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, এরপর চীন

    আগামীকাল মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, এরপর চীন

    জাতি গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ প্রধানমন্ত্রী

    জাতি গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ প্রধানমন্ত্রী

    মেলোনিকে নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি উত্তেজনা

    মেলোনিকে নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি উত্তেজনা