দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের গ্লানি ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) স্বদেশের মাটিতে পা রাখছেন বাংলাদেশের রাজনীতির এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তার এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নয়, বরং তা বাংলাদেশের বর্তমান টালমাটাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন আশার সঞ্চার হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গত কয়েকদিন ধরেই রাজধানী ঢাকা এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে; বিমানবন্দর থেকে শুরু করে পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে, গুলশান থেকে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে।
তারেক রহমান এমন এক সময়ে দেশে ফিরছেন যখন বাংলাদেশ এক চরম রাজনৈতিক নেতৃত্ব শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্র এখন তুঙ্গে। গত কয়েক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া কিছু সহিংস ঘটনা দেশকে অস্থিতিশীলতার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার ঘটনা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শরিফ ওসমানের মতো একজন উদীয়মান নেতাকে হত্যা করা মূলত আসন্ন নির্বাচনকে বানচাল করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। এই হত্যাকাণ্ড কেবল এক ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর আঘাত।
একইসাথে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ওপর নজিরবিহীন আক্রমণ শুরু হয়েছে। দেশের শীর্ষ দুটি গণমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে উগ্রবাদী হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও নিউএইজ সম্পাদক নূরুল কবিরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ও মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।
ছায়ানট ও উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে আঘাত করা হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে বসবাসরত দুইজন বিতর্কিত ইউটিউবারের উসকানিমূলক বক্তব্যে দেশে ‘মব ভায়োলেন্স’-এর সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাইরে থেকে প্ররোচনা দিয়ে দেশের ভেতরে অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি বিশেষ মহল দেশকে নেতৃত্বহীন করতে চায়। এমন এক অরাজক পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সশরীরে উপস্থিতি জাতীয় ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে মাইলফলক হতে পারে।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শেষে তিনি যখন রাজনীতিতে সক্রিয় হন, তখন থেকেই তার প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ফুটে ওঠে। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের ব্যক্তিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার ধৈর্য এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি ‘তৃণমূল সমন্বয় সভা’র মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত গড়ে তুলেছিলেন। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমান কেবল জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র হিসেবে রাজনীতিতে আসেননি, বরং তিনি নিজের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে দলের ভেতরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তার ব্যক্তিত্বে একইসাথে আভিজাত্য এবং দেশের মানুষের প্রতি মমত্ববোধের এক বিরল সমন্বয় দেখা যায়। দীর্ঘ ১৮ বছরের নির্বাসনে তিনি নিজেকে একজন পরিণত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
এক-এগারোর সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকেই তারেক রহমান নানা ষড়যন্ত্রের শিকার বলে মনে করেন তার দল। তাদের দাবি, একের পর এক মিথ্যা মামলা এবং দণ্ড তারেক রহমানকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি। বরং নির্বাসিত জীবন তাকে বিশ্বরাজনীতি ও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। তিনি দূর প্রবাসে থেকেও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দলের প্রতিটি নেতা-কর্মীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি। তার ব্যক্তিত্বের এই ডিজিটাল রূপান্তর তাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
গত ১৭ বছর তারেক রহমানের জন্য ছিল এক অগ্নিপরীক্ষার সময়। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দাবি, এক-এগারোর সরকারের সময় নির্মম শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া থেকে শুরু করে নির্বাসিত জীবনে আইনি লড়াই- সবকিছুই তারেক রহমান মোকাবিলা করেছেন অসীম সাহসের সঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের এই দীর্ঘ নির্বাসন তাকে কেবল একজন নেতাই নয়, বরং গণমানুষের আবেগের প্রতীকে পরিণত করেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আদর্শের জন্য দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে এবং প্রিয় জন্মভূমি থেকে দূরে থেকেও টিকে থাকা যায়।
নির্বাসনে থাকাকালীন তিনি কেবল দলের হাল ধরেননি, বরং দেশের রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের জন্য ‘৩১ দফা’ রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন। তার এই প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা তাকে একজন সাধারণ রাজনীতিবিদ থেকে রাষ্ট্রচিন্তাবিদে উন্নীত করেছে। তিনি তার সাম্প্রতিক এক ভার্চুয়াল বক্তব্যে বলেছিলেন, “বাংলাদেশ আর পেছনে ফিরবে না। আমরা এমন এক রাষ্ট্র গড়তে চাই যেখানে মানুষের ভোটাধিকার থাকবে নিরাপদ।” তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, নির্বাসিত জীবনে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এক সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করেছেন।
তারেক রহমানকে কেন ‘তৃণমূলের নেতা’ বলা হয়, তার উত্তর পাওয়া যায় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে। তিনি যখনই কথা বলেন, তখনই তার কণ্ঠে শোনা যায় দেশের প্রান্তিক মানুষের অধিকারের কথা। বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পালস বা নাড়ি বোঝেন। তিনি জানেন যে, দেশের উন্নয়ন কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক হলে চলবে না, বরং উন্নয়ন পৌঁছাতে হবে গ্রাম থেকে গ্রামে। তারেক রহমানের এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেছে।
বর্তমান অস্থির সময়ে যখন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, তখন তারেক রহমানের দেশে ফেরা তাদের মনে স্বস্তি দিচ্ছে। এক ভার্চুয়াল সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, “ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয়, কিন্তু জনগণের ঐক্য সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবে।” তিনি বারবার ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমান এখন কেবল একটি দলের নেতা নন, তিনি এক বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মানুষ তাকে এখন ত্রাতা হিসেবে দেখছে।
বিশ্বের ইতিহাসে দেখা গেছে, বহু জনপ্রিয় নেতা দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এসে জাতীয় মুক্তি ও পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারেক রহমানের ফিরে আসাকে অনেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনি বা বেনজির ভুট্টোর প্রত্যাবর্তনের সাথে তুলনা করছেন। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ১৫ বছরের নির্বাসন শেষে ফ্রান্সে থেকে ইরানে ফিরেছিলেন এবং পুরো দেশে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। ফিলিপাইনের অ্যাকুইনো বা পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফের প্রত্যাবর্তনও তাদের দেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা জেলখানায় দীর্ঘ ২৭ বছর কাটিয়ে যখন মুক্তি পান, তখন তিনি বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। তারেক রহমানের ১৭ বছরের নির্বাসন এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম তাকে সেই স্তরের নেতাদের কাতারে নিয়ে গেছে যারা প্রতিকূলতার মুখেও দমে যাননি।
তারেক রহমান কেবল বর্তমান সঙ্কট নিরসনের মাধ্যম নন, বরং তিনি আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন বলে মত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের। তারা মনে করছেন, তারেক রহমানের প্রজ্ঞা অর্জনের প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ। তিনি কেবল বক্তৃতা বা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং দেশের শিক্ষিত সমাজ, পেশাজীবী এবং তরুণদের সাথে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি বারবার জোর দিয়েছেন ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক রাজনীতির ওপর।
সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেন, “তোমরাই আগামীর বাংলাদেশের কারিগর।” বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে, যেখানে সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের কোনো স্থান সঙ্কুচিত হবে না। তারেক রহমানের এই ‘ইনক্লুসিভ পলিটিক্স’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি তাকে একজন আধুনিক মনস্ক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বাংলাদেশ তার অস্তিত্বের সংকটে। ওসমান বিন হাদির রক্ত, গণমাধ্যমের ওপর হামলা এবং মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে যে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে, তা দমনে তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশ এখন এমন এক অভিভাবকের অপেক্ষায় আছে যিনি জাতিকে বিভক্তির রাজনীতি থেকে বের করে ঐক্যের পথে পরিচালিত করতে পারেন।
২৫ ডিসেম্বরের দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা মানে কেবল একজন মানুষের ফেরা নয়, এটি গণতন্ত্রের ফেরা, এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তির ফেরা। জনগণের সেবায় অঙ্গীকারবদ্ধ তারেক রহমান তার প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন করেছেন, তা আগামীর বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশাব্যক্ত করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।










