শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে তীব্র ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে পুরো বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বিভাগেই অনুভূত হয় শক্তিশালী এই কম্পন।
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল নরসিংদীর ঘোড়াশাল-মাধবদী অঞ্চলে, মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। কিন্তু কেন্দ্র থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরতা হওয়ায় এটি ছিল একটি ‘ভেরি শ্যালো আর্থকোয়েক’, যার ফলে কম্পনটি বহু গুণ বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে।
এই স্বল্প মাত্রার কম্পনও দেশের দুর্বল কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং অপরিকল্পিত নগরীর ভয়াবহ চিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছে।
পুরান ঢাকায় প্রাণহানি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন
এই ভূমিকম্পের আঘাতে রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
প্রাণহানি: পুরান ঢাকার বংশালের কসাইটুলিতে একটি ভবনের সানশেড ভেঙে পড়ে তিন পথচারী ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত হন। দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলেও তাদের মৃত ঘোষণা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দেয়ালচাপায় এক শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং তার মা আহত হয়েছেন। নরসিংদীতেও দেয়াল ধসে আরও দুজন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ক্ষতি: ভূমিকম্পের প্রভাবে নরসিংদী ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবস্টেশনের ট্রান্সফরমারে আগুন লেগে যায়। ভবনে ফাটল দেখা দেয়ায় সাময়িকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে।
ভবনে ফাটল: রাজধানীর খিলগাঁও, আরমানিটোলা, বাড্ডা ও বারিধারা অঞ্চলের অনেক জায়গায় ভবন হেলে পড়ার খবর এসেছে। ঢাকা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু আবাসিক হলেও ফাটল দেখা দেয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা।
আহত: আতঙ্কে নিচে নামতে গিয়ে এবং লাফিয়ে পড়তে গিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৩০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। বিভিন্ন জেলার কারখানার অন্তত দুই শতাধিক শ্রমিক আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি করে আহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: বড় বিপদের আগাম সংকেত?
ভূমিকম্পের তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতি দেখে ভূতত্ত্ববিদরা বড় বিপদের আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, উৎপত্তিস্থল রাজধানীর খুব কাছাকাছি হওয়ায় ঢাকায় কম্পন বহু গুণ বেশি লেগেছে। বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর বসে আছে–ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মিজ প্লেট–যা যে কোনো সময় শক্তিশালী ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের এই ৫.৭ মাত্রার ‘শ্যালো’ কম্পন ছিল একটি স্ট্রেস রিলিজ। এর অর্থ হলো, বড় কম্পনের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। সাবডাকশন জোনে প্রচুর শক্তি জমে আছে এবং বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেন, ভূমিকম্প সাধারণত তিন ধাপে ঘটে: Foreshock, Mainshock ও Aftershock। আজকের কম্পনটি যদি Foreshock হয়ে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই বড় ধরনের কম্পনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন ভূতত্ত্ববিদরা।
ঝুঁকিতে অপরিকল্পিত নগরী
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো অপরিকল্পিত ভবন ও নগরী, যা কম মাত্রার কম্পনেও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
ঢাকার বেশিরভাগ ভবনই ভূমিকম্প সহনশীলতার মানদণ্ড পূরণ করছে না। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ঘনবসতি, পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবন, নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণ এবং বিল্ডিং রেগুলেশন না মানার সংস্কৃতি এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বড় ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে রাজধানী এবং চট্টগ্রাম।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, আজকের কম্পন ভয় দেখালেও সতর্ক করে গেছে বড় বিপদের সম্ভাবনার কথা। এখনই ভবনের নিরাপত্তা যাচাই, জরুরি দুর্যোগ প্রস্তুতি, স্কুল-অফিসে নিয়মিত ভূমিকম্প ড্রিল এবং পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত অপসারণের উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রস্তুত থাকাই এখন এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।










